Saturday, May 16, 2026

জান্নাতে একজন পুরুষ কতজন হুর পাবে

 ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর আরবি ব্যাকরণ ও ইসলামি পরিভাষা অনুযায়ী ‘হূর’ (حُوْرٌ) শব্দটি স্ত্রীলিঙ্গ। حَوْرَآءُ এর বহুবচন। এর উৎপত্তি حَوَرٌ থেকে। যার অর্থ চোখের সাদা অংশের অত্যধিক সাদা এবং কালো অংশের অত্যধিক কালো হওয়া। حَوْرَآءُ (হুর) এই জন্য বলা হয় যে, দৃষ্টি তাদের রূপ ও সৌন্দর্যকে দেখে মুগ্ধ হয়ে যাবে। হুর হল সে সমস্ত নারী যাদেরকে আল্লাহ্ তা’আলা জান্নাতে সৃষ্টি করেছেন।পবিত্র কুরআন ও হাদিসে তাঁদের অতুলনীয় রূপ, নিষ্কলুষ চরিত্র এবং চিরস্থায়ী যৌবনের বর্ণনা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। ব্যাকরণগতভাবে এটি স্ত্রীলিঙ্গ এবং মহান আল্লাহ জান্নাতে মুমিন বান্দাদের জন্য পুরস্কার ও সঙ্গী হিসেবে তাঁদের নির্ধারিত রেখেছেন। মূলত জান্নাতের অফুরন্ত নেয়ামতসমূহের মাঝে পুণ্যবতী স্ত্রী ও এই জান্নাতী হুরগণ মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ উপহার।মহান আল্লাহ বলেন, “আর আমরা তাদেরকে বড় চোখবিশিষ্ট হূরদের সাথে বিয়ে দেব”। [সূরা আদ-দোখান: ৫৪]

.
কুরআন ও হাদীসে তাদের কিছু গুণাগুণ বৰ্ণনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে: “তারা হবে অত্যন্ত শুভ্ৰ। আর এজন্যই তাদের নাম হয়েছে, হুর। কেননা, হূর শব্দ দ্বারা ঐ সমস্ত নারীদেরকে বোঝায় যাদের চোখের সাদা অংশ অত্যন্ত ফর্সা, কোন প্রকার খাদ নেই। আর যাদের চোখের কালো অংশ একেবারে কালো। তারা হবে প্রশস্ত চোখ বিশিষ্টা। তাদের এ দুটি গুণ আলোচ্য আয়াতেই বর্ণিত হয়েছে। [সূরা আল-ওয়াকি’আহ: ২২] তারা হবে সমবয়স্কা উদভিন্ন যৌবনা ও সুভাষিনী। আল্লাহ বলেন, “মুক্তাকীদের জন্য তো আছে সাফল্য, উদ্যান, আঙ্গুর, সমবয়স্কা উদভিন্ন যৌবনা তরুণী” [সূরা আন-নাবা: ৩১–৩৩] তারা হবে কুমারী আর তারা হবে স্বামী সোহাগিনী, মহান আল্লাহ্‌ বলেন, “ওদেরকে আমরা সৃষ্টি করেছি বিশেষরূপে–ওদেরকে করেছি কুমারী, সোহাগিনী ও সমবয়স্কা,”। [সূরা আল-ওয়াকি’আহঃ ৩৫–৩৭] তাদের দেখতে মনে হবে যেন মনি মুক্তা; আল্লাহ্‌ বলেন, “সুরক্ষিত মুক্তাসদৃশ” [সূরা আল-ওয়াকিআহ: ২৩] তাদের দেখতে মনে হবে যেন, পরিষ্কার ডিম। আল্লাহ্‌ বলেন, “মনে হয় যেন তারা সুরক্ষিত ডিম্ব।” [সূরা আস-সাফফাত: ৪৯] তাদেরকে এর আগে কেউ স্পর্শ করেনি। আর তারাও আপনি স্বামী ছাড়া অন্য কারো দিকে তাকায় না। মহান আল্লাহ বলেন, “সেসবের মাঝে রয়েছে বহু আনত নয়না, যাদেরকে আগে কোন মানুষ অথবা জিন স্পর্শ করেনি।” [সূরা আর-রাহমান: ৫৬] অন্যত্র বলা হয়েছে, “তাদের সংগে থাকবে আয়তনয়না, আয়তলোচনা হুরীগণ।” [সূরা আস-সাফফাত: ৪৮] আরও বলা হয়েছে, “তারা হূর, তাঁবুতে সুরক্ষিতা।” [সূরা আর রাহমান: ৭১] তারা দেখতে মূল্যবান পাথরের মত সুন্দর ও মসৃন হবে। আল্লাহ বলেন, “তারা যেন পদ্মরাগ ও প্রবাল।” [সূরা আর-রাহমান: ৫৭] তাদের সৌন্দর্য এমন যে, তা বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীন সার্বিকভাবে ফুটে উঠবে। আল্লাহ বলেন, “সে উদ্যানসমূহের মাঝে রয়েছে সুশীলা, সুন্দরীগণ।” [সূরা আর-রাহমান: ৭০]
.
জান্নাতে মুমিন বান্দাদের জন্য কতজন হুর থাকবে তার স্পষ্ট বর্ণনা এই হাদিসে পাওয়া যায়,রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সুন্নাহতে যা সহীহ সূত্রে প্রমাণিত, তা হলো জান্নাতে প্রত্যেক মুমিনের জন্য দুইজন স্ত্রী থাকবে; আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘যে দল প্রথমে জান্নাতে প্রবেশ করবে তাদের চেহারা পূর্ণিমার রাতের চাঁদের মত উজ্জ্বল হবে। তারা সেখানে থুথু ফেলবে না, নাক ঝাড়বেনা, মল মূত্র ত্যাগ করবেনা। সেখানে তাদের পাত্র হবে স্বর্ণের; তাদের চিরুণী হবে স্বর্ণ ও রৌপ্যের, তাদের ধুনুচিতে থাকবে সুগন্ধি কাষ্ঠ। তাদের গায়ের ঘাম মিসকের মত সুগন্ধময় হবে। তাদের প্রত্যেকের জন্য এমন দু’জন স্ত্রী থাকবে যাদের সৌন্দর্যের কারণে গোশত ভেদ করে পায়ের নলার হাড়ের মজ্জা দেখা যাবে। তাদের মধ্যে কোন মতভেদ থাকবে না; পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ থাকবে না। তাদের সকলের অন্তর এক অন্তরের মত হবে। তারা সকাল- সন্ধ্যায় আল্লাহর তাসবীহ পাঠ করতে থাকবে।”(সহীহ বুখারী: ৩২৪৫; সহীহ মুসলিম: ২৮৩৪)
.
এই হাদীসের কিছু সনদে এই দুই স্ত্রীকে ‘হুরুল ঈন’ হিসেবে নির্দিষ্ট করা হয়েছে, আবার অন্য কিছু বর্ণনায় তা নির্দিষ্ট না করে সাধারণভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া জান্নাতে দুইয়ের অধিক স্ত্রী থাকা—তা বিবাহের মাধ্যমে হোক কিংবা দাসী (তাসার্রী) হিসেবে হোক—এ প্রসঙ্গে সহীহ হাদীস বর্ণিত হয়েছে, তবে তার অর্থ সরাসরি স্পষ্ট নয়। আবার যেসব হাদীসের বক্তব্য এ বিষয়ে স্পষ্ট, সেগুলো শুদ্ধতার বিচারে ‘সহীহ’ নয়। এ বিষয়ে আলেমদের বিস্তারিত বিশ্লেষণ পরে আসছে। তবে এসব হাদীসের মূল সারকথা ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম আল-জাওযিয়্যাহ (রাহি.) তাঁর ‘হাদীউল আরওয়াহ’ গ্রন্থে এভাবে তুলে ধরেছেন:”لا ريب أن للمؤمن في الجنة أكثر من اثنتين لما في الصحيحين [البخاري (3243)، ومسلم (2838)] من حديث أبي عمران الجوني، عن أبي بكر بن عبد الله بن قيس، عن أبيه قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: (أن للعبد المؤمن في الجنة لخيمة من لؤلؤ مجوفة طولها ستون ميلا ، للعبد المؤمن فيها أهلون ، فيطوف عليهم لا يرى بعضهم بعضا)”এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, জান্নাতে একজন মুমিনের জন্য দুইয়ের অধিক স্ত্রী থাকবে। কারণ সহীহাইন [বুখারী: ৩২৪৩, মুসলিম: ২৮৩৮] এর হাদীসে বর্ণিত হয়েছে— আবু ইমরান আল-জাওনী, আবু বকর ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে কায়স থেকে এবং তিনি তাঁর পিতা (আবু মুসা আশআরী) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:’জান্নাতে মুমিন বান্দার জন্য একটি ফাঁপা মুক্তার তৈরি তাঁবু থাকবে, যার উচ্চতা (বা দৈর্ঘ্য) হবে ষাট মাইল। সেখানে মুমিনের পরিবার-পরিজন (স্ত্রীগণ) অবস্থান করবে। মুমিন ব্যক্তি তাদের প্রত্যেকের কাছে যাতায়াত করবে, কিন্তু (বিশালত্বের কারণে) তারা একে অপরকে দেখতে পাবে না।”(সূত্র: হাদীউল আরওয়াহ, পৃষ্ঠা: ২৩২)
.
প্রিয় পাঠক, জান্নাতে মুমিনদের পুরস্কার হিসেবে প্রাপ্ত ‘হুর’ বা জীবনসঙ্গিনীদের সংখ্যা নিয়ে বিজ্ঞ আলেমগণের বিভিন্ন তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও মতামত রয়েছে। আমরা পার্থিব নারী ও জান্নাতি হুরদের মধ্যকার পার্থক্যের দীর্ঘ আলোচনায় না গিয়ে সংক্ষেপে এ বিষয়ক মূল তথ্যগুলো আপনার সামনে উপস্থাপন করছি:
.
▪️​প্রথম মত: জান্নাতে মুমিনের স্ত্রীদের সংখ্যা বিষয়ে উলামায়ে কেরামের একটি শক্তিশালী অভিমত হলো—প্রত্যেক মুমিন জান্নাতে ন্যূনতম দুইজন এমন স্ত্রী লাভ করবেন, যারা দুনিয়াতে ঈমানের পথে তার সঙ্গিনী ছিলেন। এর পাশাপাশি তাঁর ঈমানি মর্যাদা ও নেক আমলের ভিত্তিতে মহান আল্লাহ উপহারস্বরূপ অগণিত ‘হুর’ দান করবেন। দুনিয়ার পুণ্যময় সম্পর্কের পূর্ণতা এবং জান্নাতি নেয়ামতের এই অপূর্ব সমন্বয়েই মুমিনের চিরস্থায়ী জীবন হবে পরম আনন্দময় ও তৃপ্তিদায়ক।
.
​শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:وقد صح : لكل رجل من أهل الجنة زوجتان من الإنسيات ، سوى الحور العين”এটি প্রমাণিত যে, জান্নাতবাসী প্রত্যেক পুরুষের জন্য মানবজাতি থেকে (অর্থাৎ দুনিয়া থেকে আসা) দুইজন করে স্ত্রী থাকবে, যা জান্নাতের হুর (হুরুল ঈন) ব্যতীত।”(ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমুউ ফাতাওয়া,খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ৪৩২) ইবনে তাইমিয়াহ (রাহিমাহুল্লাহ) এখানে মূলত বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত সেই সহিহ হাদিসটির দিকে ইঙ্গিত করেছেন, যেখানে বলা হয়েছে জান্নাতিদের প্রত্যেকের অন্তত দুইজন করে স্ত্রী থাকবে। শাইখ এখানে স্পষ্ট করেছেন যে, এই ‘দুইজন স্ত্রী’ বলতে দুনিয়ার নারীদের (মানুষ) বোঝানো হয়েছে, যারা জান্নাতে যাওয়ার পর হুরদের অতিরিক্ত হিসেবে সেখানে অবস্থান করবেন।হাফিয ইবনে কাসীর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:”المراد من هذا أن هاتين من بنات آدم، وله غيرهما من الحور العين ما شاء الله عز وجل”এর অর্থ হলো এই যে, এরা দুজন (দুনিয়ার) আদম সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত; আর এদের বাইরেও জান্নাতে তাঁর জন্য ‘হুরদের’ মধ্য থেকে আল্লাহ যা ইচ্ছা করবেন (ততসংখ্যক) স্ত্রী থাকবে।”(সূত্র: আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া; খণ্ড: ২০; পৃষ্ঠা: ৩৪১)
.
​আবার কিছু আলেম আরও বলেছেন যে, দুজন হলো সর্বনিম্ন সংখ্যা, অন্যথায় প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি হবে।
.
শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, আবুল ফাদল আহমাদ বিন আলি ইবনু হাজার আল-আসকালানি,(রাহিমাহুল্লাহ) [জন্ম: ৭৭৩ হি: মৃত: ৮৫২ হি:] বলেন:”قوله: (ولكل واحد منهم زوجتان) أي: من نساء الدنيا؛ فقد روى أحمد من وجه آخر عن أبي هريرة مرفوعا – في صفة أدنى أهل الجنة منزلة -: (وإن له من الحور العين لاثنتين وسبعين زوجة ، سوى أزواجه من الدنيا) وفي سنده شهر بن حوشب، وفيه مقال. ولأبي يعلى في حديث الصور الطويل من وجه آخر عن أبي هريرة في حديث مرفوع: (فيدخل الرجل على ثنتين وسبعين زوجة مما ينشئ الله، وزوجتين من ولد آدم) وأخرجه الترمذي من حديث أبي سعيد رفعه: (إن أدنى أهل الجنة الذي له ثمانون ألف خادم، وثنتان وسبعون زوجة) وقال: غريب. ومن حديث المقدام بن معد يكرب عنده: (للشهيد ست خصال) الحديث. وفيه: (ويتزوج ثنتين وسبعين زوجة من الحور العين) وفي حديث أبي أمامة عند ابن ماجه والدارمي رفعه: (ما أحد يدخل الجنة إلا زوجه الله ثنتين وسبعين من الحور العين، وسبعين وثنتين من أهل الدنيا) وسنده ضعيف جدا.وأكثر ما وقفت عليه من ذلك ما أخرج أبو الشيخ في العظمة والبيهقي في البعث من حديث عبد الله بن أبي أوفى رفعه: (إن الرجل من أهل الجنة ليزوج خمسمائة حوراء، أو إنه ليفضي إلى أربعة آلاف بكر، وثمانية آلاف ثيب) وفيه راو لم يسم. وفي الطبراني من حديث ابن عباس: (إن الرجل من أهل الجنة ليفضي إلى مائة عذراء). وقال ابن القيم: ليس في الأحاديث الصحيحة زيادة على زوجتين ، سوى ما في حديث أبي موسى: (إن في الجنة للمؤمن لخيمة من لؤلؤة له فيها أهلون، يطوف عليهم) . قلت: الحديث الأخير صححه الضياء.وفي حديث أبي سعيد عند مسلم في صفة أدنى أهل الجنة: (ثم يدخل عليه زوجتاه) .والذي يظهر أن المراد أن أقل ما لكل واحد منهم زوجتان”
রাসূল (ﷺ)-এর বাণী:আর তাদের প্রত্যেকের জন্য থাকবে দুইজন স্ত্রী’—অর্থাৎ দুনিয়ার নারীদের মধ্য থেকে।ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ) অন্য একটি সূত্রে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে মারফু হিসেবে (রাসূলের কথা হিসেবে) জান্নাতের সর্বনিম্ন স্তরের ব্যক্তির বিবরণ দিতে গিয়ে বর্ণনা করেছেন: “আর তার জন্য হুরুল ‘ঈনদের মধ্য থেকে বাহাত্তরজন স্ত্রী থাকবে, তার দুনিয়ার স্ত্রীগণ ছাড়া। তবে এর বর্ণনাসূত্রে ‘শাহর ইবনে হাওশাব’ রয়েছেন, যার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে হাদিস বিশারদদের সমালোচনা আছে। ইমাম আবু ইয়া’লা শিঙায় ফুঁৎকার সংক্রান্ত দীর্ঘ হাদিসে অন্য সূত্রে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে মারফু হিসেবে বর্ণনা করেন: “জান্নাতি ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার নবসৃষ্ট (হুরদের) মধ্য থেকে ৭২ জন এবং আদম সন্তানদের (দুনিয়ার নারীদের) মধ্য থেকে ২ জন স্ত্রীর কাছে প্রবেশ করবেন।”ইমাম তিরমিযী আবু সাঈদ (রা.) থেকে মারফু হিসেবে বর্ণনা করেছেন:”নিশ্চয়ই জান্নাতের সর্বনিম্ন স্তরের ব্যক্তির ৮০ হাজার সেবক এবং ৭২ জন স্ত্রী থাকবে।” তবে ইমাম তিরমিযী একে ‘গরীব’ (দুর্বল পর্যায়ের) বলেছেন। এছাড়া মিকদাম ইবনে মাদিকারিব (রা.) থেকে বর্ণিত তিরমিযীর অপর এক হাদিসে শহীদের ছয়টি বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে:”সে (শহীদ) ৭২ জন হুরকে বিবাহ করবে।” ইমাম ইবনে মাজাহ এবং দারেমিতে আবু উমামা (রা.) থেকে মারফু সূত্রে বর্ণিত হয়েছে:”জান্নাতে প্রবেশকারী প্রত্যেক ব্যক্তিকে আল্লাহ ৭২ জন হুর এবং ৭২ জন দুনিয়ার নারীর সাথে বিবাহ দেবেন।”কিন্তু এর বর্ণনাসূত্র অত্যন্ত দুর্বল (যঈফ জিদ্দান)। এ বিষয়ে আমি (ইবনু হাজার) সর্বোচ্চ যে সংখ্যাটি পেয়েছি, তা হলো আবু শেখ ‘আল-আজমাহ’ গ্রন্থে এবং বায়হাকী ‘আল-বা’স’ গ্রন্থে আবদুল্লাহ ইবনে আবি আউফা (রা.) থেকে মারফু সূত্রে বর্ণনা করেছেন: “জান্নাতের একজন ব্যক্তি পাঁচশ হুরকে বিবাহ করবে, অথবা সে চার হাজার কুমারী এবং আট হাজার অকুমারী স্ত্রীর সান্নিধ্য লাভ করবে।”তবে এই বর্ণনায় একজন ‘অজ্ঞাত’ (নামহীন) রাবী রয়েছেন।ইমাম তাবারানি ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন: “জান্নাতের একজন ব্যক্তি একশ কুমারী স্ত্রীর সান্নিধ্য লাভ করবেন।”ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেছেন:”সহীহ হাদিসসমূহে ‘দুইজন স্ত্রীর’ বেশি কোনো সুনির্দিষ্ট সংখ্যার উল্লেখ আসেনি; কেবল আবু মুসা (রা.)-এর হাদিসটি ছাড়া। সেখানে বলা হয়েছে: ‘জান্নাতে মুমিনের জন্য একটি মুক্তার তাবু থাকবে, সেখানে তার স্ত্রীরা থাকবেন এবং তিনি তাদের কাছে যাতায়াত করবেন’।” আমি (ইবনু হাজার) বলছি: শেষোক্ত হাদিসটিকে ইমাম জিয়া আল-মাকদিসি সহীহ বলেছেন। সহীহ মুসলিম-এ আবু সাঈদ (রা.) থেকে জান্নাতের সর্বনিম্ন স্তরের ব্যক্তির বর্ণনায় এসেছে: “অতঃপর তার নিকট তার দুইজন স্ত্রী প্রবেশ করবেন।” সারকথা এই যে, আপাতদৃষ্টিতে এটিই স্পষ্ট হয় যে—জান্নাতিদের প্রত্যেকের জন্য ‘ন্যূনতম’ দুইজন করে স্ত্রী নিশ্চিতভাবে থাকবেন।”( ইবনু হাজার ফাতহুল বারী খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৩২৬)
.
পক্ষান্তরে, অনেক আলেম জান্নাতে দুনিয়ার নারীদের এই আধিক্যের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তাঁদের মতে, এই অতিরিক্ত সংখ্যা কেবল ‘হূর-ঈন’দের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তবে ইমাম ইবনুল কায়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ)-এর বক্তব্যে এ বিষয়ে কিছুটা ভিন্ন ও সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ পাওয়া যায়। আলোচনার শুরুতে তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে, প্রত্যেক মুমিন দুইজন হূর-ঈন স্ত্রী পাবেন এবং আমল অনুযায়ী আরও অনেক দাসী লাভ করবেন। কিন্তু আলোচনার সমাপ্তিতে তিনি সুনিশ্চিতভাবে এই মত ব্যক্ত করেছেন যে, একজন মুমিন জান্নাতে দুইয়ের অধিক স্ত্রী লাভ করবেন—তা দুনিয়ার নারী হোক কিংবা হূর-ঈন।”তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:(لكل امرئ منهم زوجتان) والظاهر أنهن من الحور العين”প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য কমপক্ষে দুইজন স্ত্রী থাকবে; এবং এটি সুস্পষ্ট যে তারা জান্নাতি হূরদের মধ্য থেকেই হবে।”(সূত্র: হাদিউল আরওয়াহ, পৃষ্ঠা: ১২৫)
.
​জান্নাতে হুর বা সঙ্গিনীদের সংখ্যা সংক্রান্ত বর্ণনাগুলোর ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর ‘হাদিউল আরওয়াহ’ গ্রন্থে এক চমৎকার সমন্বয় করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, অধিকাংশ বিশুদ্ধ হাদিসে মূলত দুইজন স্ত্রীর কথা এসেছে; তবে বাহাত্তরজনের বর্ণনাটি যদি সঠিক ধরা হয়, তবে তা দ্বারা দুইজন মূল স্ত্রীর অতিরিক্ত অন্যান্য সেবিকা বা হুরদের বোঝানো হতে পারে, যাদের সংখ্যা জান্নাতীদের মর্যাদা অনুযায়ী নির্ধারিত হবে। অন্যভাবে বলা যায়, এই সংখ্যাটি মূলত মুমিনের শারীরিক সক্ষমতার একটি রূপক প্রকাশ। যেমনটি আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত তিরমিজির একটি সহিহ হাদিসে এসেছে যে, জান্নাতে একজন মুমিনকে একশ জনের সমান শক্তি প্রদান করা হবে। সুতরাং বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লিখিত এই সংখ্যাগুলো জান্নাতের অবারিত নেয়ামত ও মুমিনের অসীম সামর্থ্যের বহিঃপ্রকাশ হওয়াটাই অধিক যুক্তিযুক্ত। প্রকৃত জ্ঞান কেবল আল্লাহর নিকটেই রয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে দেখুন: হাদিউল আরওয়াহ, পৃষ্ঠা: ১২৩)
.
▪️দ্বিতীয় মত: জান্নাতে মুমিনের জন্য দুনিয়ার দুইজন স্ত্রী এবং কমপক্ষে সত্তরজন হুরঈন থাকবে।এর ঊর্ধ্বে কোনো সীমা নেই।
.
​ইমাম ইরাকী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:”الزوجتان من نساء الدنيا، والزيادة على ذلك من الحور العين… قد تبين ببقية الروايات أن الزوجتين أقل ما يكون لساكن الجنة من نساء الدنيا، وأن أقل ما يكون له من الحور العين سبعون زوجة. وأما أكثر ذلك فلا حصر له … وروى الترمذي من رواية ثوير بن أبي فاختة عن ابن عمر رضي الله عنهما قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: (إن أدنى أهل الجنة منزلة لمن ينظر إلى جنانه، وأزواجه، ونعيمه، وخدمه، وسرره، مسيرة ألف سنة، وأكرمهم على الله من ينظر إلى وجهه غدوة وعشية)”জান্নাতীদের জন্য দুনিয়ার নারীদের মধ্য থেকে দুইজন স্ত্রী থাকবেন, আর এর অতিরিক্ত যা থাকবে তা হবে হুরুল ঈনদের মধ্য থেকে। … অন্যান্য বর্ণনার মাধ্যমে এটি স্পষ্ট হয়েছে যে, জান্নাতবাসীদের জন্য দুনিয়ার নারীদের মধ্য থেকে সর্বনিম্ন দুইজন স্ত্রী থাকবেন এবং হুরুল ঈনদের মধ্য থেকে সর্বনিম্ন সত্তরজন স্ত্রী থাকবেন। আর এর সর্বোচ্চ সংখ্যার কোনো সীমা নেই। … ইমাম তিরমিজি (রহ.) সুওয়াইর ইবন আবি ফাখতাহ-এর সূত্রে ইবনু উমর (রাযি.) হতে বর্ননা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:”একজন সাধারণ মর্যাদাসম্পন্ন জান্নাতীর বাগান, স্ত্রী, আমোদ-প্রমোদের সামগ্ৰী, খাদেম এবং খাট-পালং ও আসন সমূহ কেউ দেখতে চাইলে তা তার জন্য হাজার বছরের পথ। তাদের মধ্যে আল্লাহ তা’আলার নিকটে সবচাইতে মর্যাদাবান ব্যক্তি সকাল-সন্ধ্যায় তার চেহারা দর্শন করবে।”(সূত্র: ত্বরহুত তাসরীব ফী শরহিত তাকরীব; ৮/২৭০)
.
▪️তৃতীয় মত: জান্নাতে মুমিনের জন্য কমপক্ষে দুজন হুরঈন থাকবে এবং এরপর যার যার আমল অনুযায়ী বৃদ্ধি পাবে।
.
ইবনে রজব হাম্বলী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:هاتان الزوجتان من الحور العين، لا بد لكل رجل دخل الجنة منهما، وأما الزيادة على ذلك، فتكون بحسب الدرجات والأعمال، ولم يثبت في حصر الزيادة على الزوجتين شيء “হুরদের মধ্য থেকে এই দুইজন স্ত্রী প্রত্যেক জান্নাতবাসীর জন্য সুনিশ্চিত। এর বাইরে অতিরিক্ত স্ত্রীর সংখ্যা জান্নাতের উচ্চমর্যাদা ও আমলের ওপর নির্ভরশীল। তবে দুইজনের অধিক স্ত্রীর কোনো নির্দিষ্ট সীমা কোনো বর্ণনা দ্বারা সাব্যস্ত হয়নি।” (সূত্র: আত-তাখউইফ মিনান নার (পৃষ্ঠা: ২৬৮)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] বলেন:لكل واحد زوجتان من الحور العين غير زوجاته من الدنيا، وغير ما يعطى من الزوجات الأخريات من الحور العين، وكل واحد لا ينقص عن زوجاته من الحور العين مع ما له من زوجات من الدنيا”প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য হুরদের মধ্য থেকে দুইজন করে স্ত্রী থাকবে, যা তাদের দুনিয়ার স্ত্রীদের বাইরে এবং হুরদের মধ্য থেকে প্রদান করা অন্যান্য স্ত্রীদেরও অতিরিক্ত। আর দুনিয়ার স্ত্রীদের পাশাপাশি হুরদের মধ্য থেকে প্রাপ্ত স্ত্রীদের সংখ্যার ক্ষেত্রে কারো কোনো কমতি হবে না।”(দুরুস লিশ-ইমাম আব্দুল আজিজ বিন বায: ৪/২১)
ইমাম (রাহিমাহুল্লাহ) আরও বলেন;”يعطى كل زوج من الحور العين ما شاء الله منهن، على حسب أعماله الصالحة وتقواه لله جل وعلا، ولكل واحد زوجتان من الحور العين، غير ما يعطى منهن زيادة على ذلك، كل واحد له زوجتان من الحور العين، هذا أمر معلوم، لكن الزيادة الله الذي يعلم مقدارها”প্রত্যেক ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী হুর দান করবেন, যা নির্ভর করবে ওই ব্যক্তির নেক আমল এবং আল্লাহর প্রতি তাঁর তাকওয়ার (পরহেজগারিতার) ওপর। তবে প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য (জান্নাতে) অন্তত দুইজন হুর নিশ্চিত থাকবে; এর অতিরিক্ত যা দেওয়া হবে তা এই দুইজনের বাইরে। প্রত্যেকের জন্য দুইজন করে হুর থাকা একটি সুনিশ্চিত বিষয়, তবে এর অতিরিক্ত আর কতজন দেওয়া হবে তার পরিমাণ আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানেন না।”—[সূত্র: ফাতাওয়া নূরুন আলাদ-দারব, ইবনে বায; খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ৩৫১]
.
পরিশেষে, উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে এটি স্পষ্ট যে, রাসূল (ﷺ)-এর হাদিস এবং আল্লামা ইবনে কাইয়্যিম ও হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর গবেষণালব্ধ মতানুযায়ী—জান্নাতের প্রত্যেক শহীদ তাঁদের স্ত্রীদের পাশাপাশি সত্তরোর্ধ্ব হূর লাভ করবেন। তবে সাধারণ মুমিনদের জন্য হূরের নির্দিষ্ট সংখ্যা বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট সহীহ হাদীস না থাকলেও ওলামায়ে কেরাম একমত যে, প্রত্যেক মুমিন জান্নাতে ন্যূনতম দুইজন স্ত্রী পাবেন। এই দুই স্ত্রী জান্নাতের হূর হবেন নাকি দুনিয়ার মুমিন নারী—তা নিয়ে তাত্ত্বিক মতভেদ থাকলেও চূড়ান্ত জ্ঞান কেবল মহান আল্লাহর নিকটই নিহিত। সুতরাং এই বিষয়টি নিয়ে অযথা চিন্তা ভাবনা কিংবা বাড়াবাড়ি না করে কিভাবে জান্নাতে যাওয়া যায় সেটা নিয়ে সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো উচিত। গৃহীত ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-২৫৭৫০৯)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

তামাত্তু হজের ক্ষেত্রে একই বছরে নিজের পক্ষ থেকে উমরাহ এবং অন্যের পক্ষ থেকে হজ্জ করা কি জায়েয

 করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর একই সফরে নিজের পক্ষ থেকে উমরাহ এবং মৃত বা শারীরিক অক্ষম ব্যক্তির পক্ষ থেকে ‘বদলি হজ্জ’ আদায় করা শরীয়তসম্মত ও সম্পূর্ণ বৈধ। কারন হজ্জে তামাত্তু সহীহ হওয়ার জন্য উমরাহ ও হজ্জ একই ব্যক্তির পক্ষ থেকে হওয়া শর্ত বা জরুরি নয়; ফলে একজন নিজের জন্য উমরাহ করে অন্যের জন্য হজ্জ করতে পারেন, অথবা এর উল্টোটাও (অর্থাৎ নিজের পক্ষ থেকে হজ্জ অন্যের পক্ষ থেকে ওমরাহ) জায়েজ, এমনকি উমরাহ ও হজ্জ দুইজন ভিন্ন ব্যক্তির পক্ষ থেকেও আদায় করা যায়। তবে শর্ত হলো, অন্যের পক্ষ থেকে বদলি হজ্জ বা উমরাহ করার আগে নিজের ফরয হজ্জ ও উমরাহ অবশ্যই সম্পন্ন থাকতে হবে। এছাড়া তামাত্তু হজ্জের কারণে যে ‘হাদি’ বা দমে-শোকর (কুরবানি) ওয়াজিব হয়, তা যার পক্ষ থেকে হজ্জ করা হচ্ছে তার পক্ষ থেকেই সম্পন্ন করতে হবে।

.
​আল-মাওসুআ আল-ফিকহিয়্যা আল-কুওয়াইতিয়্যা’ গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে:ولا يعتبر وقوع النسكين عن شخص واحد, فلو اعتمر لنفسه وحج عن غيره ، أو عكسه ، أو فعل ذلك عن اثنين : كان عليه دم التمتع ، لظاهر الآية, وهذا عند جمهور الفقهاء. وقال المالكية: في شرط كونهما عن شخص واحد تردد, أنكره ابن عرفة وخليل في مناسكه, وقال ابن الحاجب: الأشهر اشتراطه.”হজ্জ ও উমরাহ—উভয় ইবাদত একই ব্যক্তির পক্ষ থেকে হওয়া (তামাত্তু হজ্জ সাব্যস্ত হওয়ার জন্য) শর্ত নয়। সুতরাং, কেউ যদি নিজের পক্ষ থেকে উমরাহ করেন এবং অন্যের পক্ষ থেকে হজ্জ আদায় করেন, অথবা এর বিপরীতটি করেন (অর্থাৎ অন্যের পক্ষে উমরাহ ও নিজের পক্ষে হজ্জ), কিংবা এই দুটি কাজ (উমরাহ ও হজ্জ) পৃথক দুইজন ব্যক্তির পক্ষ থেকে আদায় করেন—তবে পবিত্র কুরআনের আয়াতের বাহ্যিক মর্ম অনুযায়ী তার ওপর ‘দমে তামাত্তু’ (তামাত্তু হজের কোরবানি) ওয়াজিব হবে। জমহুর ফকিহগণের অভিমত এটাই। তবে মালিকী মাযহাবের মতে, এই উভয়টি একই ব্যক্তির পক্ষ থেকে হওয়ার শর্তযুক্ত হওয়ার ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। ইবনে আরাফাহ এবং খলীল তাদের ‘মানাসিক’ গ্রন্থে এই শর্তটি অস্বীকার করেছেন (অর্থাৎ তাদের মতে এটি শর্ত নয়)। অন্যদিকে ইবনে হাজিব বলেছেন: এটি শর্ত হওয়াটাই অধিক প্রসিদ্ধ (মাশহুর) অভিমত…”উদ্ধৃতি সমাপ্ত;আল-মাওসূআতুল ফিকহিয়্যাহ’ ১৪/১১; আরও দেখুন: আত-তাজ ওয়াল ইকলীল ;৪/৮৩),শারহুল মুহাযযাব; ৭/১৭৬), কাশশাফুল কিনা; ২/৪১৪)।
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণ বলেন: تجوز النيابة في الحج عن الميت، وعن الموجود الذي لا يستطيع الحج، ولا يجوز للشخص أن يحج مرة واحدة ويجعلها لشخصين، فالحج لا يجزئ إلا عن واحد، وكذلك العمرة .لكن لو حج عن شخص واعتمر عن آخر في سنة واحدة أجزأه، إذا كان الحاج قد حج عن نفسه واعتمر عنها”মৃত ব্যক্তি অথবা এমন জীবিত ব্যক্তি যিনি হজ্জ করতে অক্ষম, তাদের পক্ষ থেকে প্রতিনিধি হয়ে হজ্জ করা জায়েয।তবে কোনো ব্যক্তির জন্য এটি বৈধ নয় যে, সে একবার হজ্জ করে তা দুইজনের পক্ষ থেকে নির্ধারণ করবে।কেননা হজ্জ কেবল একজনের পক্ষ থেকেই আদায় হয়, আর উমরাহর বিধানও অনুরূপ।তবে কেউ যদি একই বছরে একজনের পক্ষ থেকে হজ্জ এবং অন্যজনের পক্ষ থেকে উমরাহ আদায় করে, তবে তা গ্রহণযোগ্য হবে, যদি উক্ত হজ্জ সম্পাদনকারী ব্যক্তি ইতিপূর্বে নিজের পক্ষ থেকে (ফরজ) হজ্জ ও উমরাহ সম্পন্ন করে থাকেন।”(ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; খণ্ড: ১১; পৃষ্ঠা: ৫৮)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

আশআরীরা কি আহলুস সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত

 ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআত হলো ইসলামের সেই অবিভাজ্য ও শাশ্বত মূলধারা, যা মূলত রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সুন্নাহ ও সাহাবায়ে কেরামের প্রদর্শিত পন্থার ওপর সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত। কিয়ামত অবধি নাজাতপ্রাপ্ত এই জামাআত সম্পর্কে নবীজি (ﷺ) ইরশাদ করেছেন যে, তিনি এবং তাঁর সাহাবীগন যে আদর্শের ওপর আছেন, যারা তার অনুসরণ করবে তারাই হবে মুক্তিপ্রাপ্ত। সুতরাং এটি কোনো সাময়িক বা বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠী নয়, বরং কুরআন ও সুন্নাহর বিশুদ্ধ মর্মার্থ এবং সাহাবীদের কর্মপদ্ধতির সমন্বয়ে গঠিত এক ভারসাম্যপূর্ণ আদর্শিক ধারা; যার মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলো অনুধাবন করা প্রতিটি মুমিনের ঈমানী চেতনার জন্য অপরিহার্য। আর এই প্রেক্ষাপটে আশআরী মতবাদ সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো স্পষ্ট করা জরুরি:

.
(১).আহলুস সুন্নাহ’র আকীদার একটি সুস্পষ্ট মূলনীতি রয়েছে, যা কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর উপর প্রতিষ্ঠিত এবং ওহীর দলীলসমূহকে সালাফদের বুঝ অনুযায়ী গ্রহণ করে।
.
(২).আহলুস সুন্নাহ তারাই, যারা বিশুদ্ধ আকীদাকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরেছেন এবং এর ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ততক্ষণ পর্যন্ত আহলুস সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না, যতক্ষণ না তারা এই আকীদা সম্পর্কে গভীর প্রজ্ঞা অর্জন করে একে বুদ্ধি, রাজনীতি, ব্যক্তিগত অভিমত ও রুচির ওপর নিরঙ্কুশ প্রাধান্য দেয়। প্রকৃতপক্ষে,যে ব্যক্তি সুন্নাহকে নিজের নেতা, পথপ্রদর্শক ও মানদণ্ড হিসেবে গ্রহন করে, সে আহলুস সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত। আর যে ব্যক্তি সুন্নাহকে নিজের বিবেক, রুচি, মত বা রাজনৈতিক চিন্তা ধারার সাথে মিলিয়ে দেখে এবং সেখান থেকে কেবল সেই অংশই গ্রহণ করে যা তার চিন্তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ সে আহলুস সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত নয়। এ কারণেই আকীদার মৌলিক বিষয়গুলোতে সালাফদের মাঝে কোনো মতভেদ দেখা যায়নি বরং তাদের বক্তব্য ও হৃদয়সমূহ ছিল একই সূত্রে গ্রথিত।
.
(৩).এতে কোন সন্দেহ নাই যে, ইমাম আবুল হাসান আশআরীর আকীদা থেকে বর্তমান আশআরীদের বিচ্যুতি ঘটেছে।বলা হয়,আবুল হাসান আশআরী তাঁর জীবনে তিনটি পর্যায় অতিক্রম করেছেন:
.
প্রথম পর্যায়: মু‘তাযিলা মতবাদে অবস্থান, যেখানে তিনি প্রায় চল্লিশ বছর তাঁর শিক্ষক আবু আলী জুব্বায়ীর সান্নিধ্যে ছিলেন।
.
দ্বিতীয় পর্যায়: কুল্লাবিয়া পর্যায়, যেখানে তিনি সাতটি সিফাত সাব্যস্ত করেন এবং আল্লাহর ইচ্ছার সাথে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সিফাত অস্বীকার করেন। এ সময় তিনি আল লামউ ফি রদ্দি আলা আহলিয যাইগ ওয়াল বিদয়ী গ্রন্থ রচনা করেন।
.
তৃতীয় পর্যায়: সুন্নী পর্যায়, যেখানে তিনি পূর্বের বিশ্বাস থেকে ফিরে এসে ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বলের আকীদা গ্রহণ করেন। এ সময় তিনি আল ইবানাহ,মাকালাতুল ইসলামিয়া, রিসালাতু ইলা আহলিস সাগর প্রভৃতি গ্রন্থ রচনা করেন এবং এ আকীদার উপরই মৃত্যুবরণ করেন। অথচ আশআরীরা তাঁর মধ্যবর্তী পর্যায়কেই গ্রহণ করে সেটির উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে।
.
(৪).আশআরীরা বহু বিষয়ে সালাফদের মতবাদের বিরোধিতা করেছে। যেমন: মুকাল্লাফ ব্যক্তির উপর সর্বপ্রথম ওয়াজিব কী?,আল্লাহর খবরী ও ইখতিয়ারী সিফাতসমূহের ব্যাপারে তাদের অবস্থান, আল্লাহর কালামে হরফ ও শব্দ অস্বীকার করা, আখিরাতে আল্লাহকে দেখার বিষয়ে তাদের মত, এবং আকীদার আরও বিভিন্ন বিষয়।
.
(৫).আশআরী ও মাতুরীদীদের মাঝে আকীদাগত প্রায় ডজনখানেক বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। কিছু মতভেদ শব্দগত, আর কিছু অর্থগত। অথচ সালাফদের আকীদার ক্ষেত্রে বক্তব্য ছিল এক ও অভিন্ন।
.
(৬). ইতিহাস জুড়ে বহু প্রসিদ্ধ ইমাম আশআরী মতবাদের সমালোচনা করেছেন। তাঁদের কেউ কেউ স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, মানুষ সুন্নাহর উপরই ছিল, যতক্ষণ না আবুল হাসান আশআরী ও তাঁর অনুসারীরা আগমন করেন। যেমন: আবু নাসর সিজযী, হারাওয়ী, ইবনু খুয়াইজ মিনদাদ, ইবনু হাজম প্রমুখ, যারা আশআরী মতবাদের সমালোচনা করেছেন। সুতরাং,আশআরী মতাদর্শের অনুসারীদেরকে নিঃশর্তভাবে আহলুস সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত করা যেমন সঠিক নয়, তেমনি তাদের ভালো কাজগুলোকে অস্বীকার করে সরাসরি সুন্নাহর গণ্ডি থেকে বের করে দেওয়াও ইনসাফপূর্ণ হবে না; বরং তাদের অবস্থা সূরা তাওবার ১০২ নম্বর আয়াতের সেই বর্ণনার মতো, যেখানে ভালো ও মন্দের মিশ্রণ রয়েছে। মূলত আহলুস সুন্নাহ শব্দটি দুটি অর্থে ব্যবহৃত হয়—একটি ব্যাপক অর্থে, যেখানে শিয়া বা খারেজীদের বিপরীতে থাকা আশআরী ও মাতুরিদীসহ সকলকেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়; আর অন্যটি সংকীর্ণ বা বিশেষ অর্থে, যেখানে কেবল তারাই অন্তর্ভুক্ত যারা আসমা ওয়াস-সিফাতসহ দ্বীনের মৌলিক বিষয়ে কোনো প্রকার অপব্যাখ্যা ছাড়াই সাহাবায়ে কেরাম ও সালাফে সালেহীনের বিশুদ্ধ আকিদাকে হুবহু ধারণ করেন। এই দ্বিতীয় সংজ্ঞায় আশআরীদের কিছু আকিদা যেহেতু জাহমিয়া বা মু‘তাযিলাদের সাথে মিলে যায়, তাই তারা এই স্তরে আহলুস সুন্নাহর মূলধারা থেকে বিচ্যুত হিসেবে বিবেচিত হন। সুতরাং আশাআরীরা আহলে সুন্নাহ’র অন্তর্ভুক্ত কিনা এ বিষয়ে আমাদের আলেমগণের অবস্থান হচ্ছে,আহলুস সুন্নাহ’ শব্দটি দুটি ভাবে ব্যবহৃত হতে পারে:
.
(১).ব্যাপক অর্থে, আশআরী শব্দটি যখন শিয়া বা রাফেযী সম্প্রদায়ের বিপরীতে যারা সাহাবায়ে কেরামের খেলাফত ও সুন্নাহর প্রতি অনুগত,এই ক্ষেত্রে,‘আহলুস সুন্নাহ’ শব্দটি আশ‘আরী, মাতুরিদীসহ,মুতাযিলাদেরকও অন্তর্ভুক্ত করে।
.
(২).বিশেষ অর্থে অর্থাৎ আহলুস সুন্নাহ’ শব্দটি অনেক সময় বিদআতীদের বিপরীত শব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই অর্থে, এর দ্বারা কেবল তারাই উদ্দেশ্য যারা প্রকৃত সুন্নাহ’র অনুসারী এবং বিশুদ্ধ আকীদার ওপর অবিচল—অর্থাৎ সালাফি ও আহলে হাদীস উলামায়ে কেরাম। এক্ষেত্রে ‘আহলুস সুন্নাহ’ পরিভাষাটি আশআরী বা অন্য কোনো গোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করে না; কারণ তারা তাদের আক্বীদার মূলে এমন কিছু নীতি যুক্ত করেছে যা সুন্নাহর পরিপন্থী (যেমন: ইলমুল কালাম)। অনেক মৌলিক বিষয়েই আহলুস সুন্নাহর (সালাফিদের) সাথে তাদের স্পষ্ট মতভেদ রয়েছে।উদাহরণস্বরূপ, পরবর্তী যুগের আশআরীরা তাকদীরের বিষয়ে জাবরিয়্যা এবং ঈমানের সংজ্ঞার ক্ষেত্রে মুরজিয়াদের মতাদর্শ পোষণ করত। তারা আল্লাহর অধিকাংশ গুণাবলিকে (সিফাত) অস্বীকার করেছে—কেবল সাতটি সিফাত ছাড়া—এই যুক্তিতে যে, আল্লাহর গুণাবলি কেবল ‘আকল’ বা যুক্তির মাপকাঠিতেই প্রমাণিত হতে হবে। তারা আল্লাহর আরশের ওপর উঠা (ইস্তিওয়া) এবং সৃষ্টির ঊর্ধ্বে তাঁর সুউচ্চ থাকা (উলূ’) অস্বীকার করে।তারা বলে,ঈমান কেবল ‘তাসদিক’ বা অন্তরের বিশ্বাসের নাম; তারা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমলকে ঈমানের অন্তর্ভুক্ত করে না…
তারা আরও দাবি করে: ‘আল্লাহ সৃষ্টিজগতের ভেতরেও নেই, বাইরেও নেই; উপরেও নেই, নিচেও নেই।’ এই জাতীয় অসংখ্য মৌলিক পার্থক্যের উপস্থিতিতে আমরা কীভাবে তাদের ‘আহলুস সুন্নাহ’র অন্তর্ভুক্ত বলতে পারি?
.
হিজরী ৮ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ শাইখুল ইসলাম ইমাম তাক্বিউদ্দীন আবুল ‘আব্বাস আহমাদ বিন ‘আব্দুল হালীম বিন তাইমিয়্যাহ আল-হার্রানী আন-নুমাইরি, (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] বলেছেন:
فَلَفْظُ “أَهْلِ السُّنَّةِ” يُرَادُ بِهِ مَنْ أَثْبَتَ خِلَافَةَ الْخُلَفَاءِ الثَّلَاثَةِ، فَيَدْخُلُ فِيْ ذَلِكَ جَمِيْعُ الطَّوَائِفِ إِلَّا الرَّافِضَةَ، وَقَدْ يُرَادُ بِهِ أَهْلُ الْحَدِيثِ وَالسُّنَّةِ الْمَحْضَةِ، فَلَا يَدْخُلُ فِيهِ إِلَّا مَنْ يُثْبِتُ الصِّفَاتِ لِلَّهِ تَعَالَى وَيَقُولُ: إِنَّ الْقُرْآنَ غَيْرُ مَخْلُوقٍ، وَإِنَّ اللَّهَ يُرَى فِي الْآخِرَةِ، وَيُثْبِتُ الْقَدْرَ، وَغَيْرَ ذَلِكَ مِنَ الْأُصُولِ الْمَعْرُوفَةِ عِنْدَ أَهْلِ الْحَدِيثِ وَالسُّنَّةِ ‘
“আহলুস সুন্নাহ’ পরিভাষাটি দ্বারা (কখনো) এমন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে বোঝানো হয়, যারা (প্রথম) তিন খলিফার খিলাফতের বৈধতাকে স্বীকার করে। এই অর্থে রাফেযী (শীআ) সম্প্রদায় ছাড়া আর বাকি সকল দলই এর অন্তর্ভুক্ত। আবার কখনো এই পরিভাষাটি দ্বারা কেবল ‘আহলুল হাদীস’ এবং ‘সুন্নাহর একনিষ্ঠ অনুসারীদের’ বোঝানো হয়। (এই বিশেষ অর্থে) কেবল তারাই এর অন্তর্ভুক্ত হবে যারা আল্লাহ তাআলার (সিফাত) গুণাবলিকে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে এবং ঘোষণা দেয় যে— কুরআন আল্লাহর সৃষ্টি (মাখলুক) নয়, পরকালে মহান আল্লাহকে সরাসরি দেখা যাবে এবং তারা তাকদীরের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করে; সেই সাথে আহলুল হাদীস ও সুন্নাহর নিকট সুপরিচিত আকিদার অন্যান্য মূলনীতিগুলোকেও মেনে চলে।”(সূত্র: মিনহাজুস সুন্নাহ আন-নববিয়্যাহ, ২য় খণ্ড, পৃ. ২২১)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:
” أهل السنة يدخل فيهم المعتزلة ، يدخل فيهم الأشعرية ، يدخل فيهم كل من لم يكفر من أهل البدع ، إذا قلنا هذا في مقابلة الرافضة .لكن إذا أردنا أن نبين أهل السنة ، قلنا : إن أهل السنة حقيقة هم السلف الصالح الذين اجتمعوا على السنة وأخذوا بها ، وحينئذ يكون الأشاعرة والمعتزلة والجهمية ونحوهم : ليسوا من أهل السنة بهذا المعنى “
“আহলুস সুন্নাহ’ শব্দটি যদি রাফেযীদের বিপরীতে ব্যবহৃত হয়, তবে এতে মুতাযিলা, আশ‘আরী এবং এমন অনেক লোক অন্তর্ভুক্ত হবে যারা মুবতাদী, তবে তাদের বিদ‘আত কুফরের পর্যায়ে পৌঁছায় না। তবে যদি আমরা ‘আহলুস সুন্নাহ’ শব্দের প্রকৃত অর্থ ব্যাখ্যা করতে চাই, তবে আমরা বলব যে, সত্যিকারের আহলুস সুন্নাহ হলো সালাফে সালেহীনগণ, যারা সুন্নাহর অনুসরণে ঐক্যবদ্ধ ছিলেন। এই ক্ষেত্রে, আশ‘আরী, মুতাযিলা, জাহমিয়া ইত্যাদি আহলুস সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত নয়।”(ইমাম ইবনু উসামীন আশ-শারহুল মুমতি‘, আলা জাদিল মুস্তাকনি খণ্ড:১১ পৃষ্ঠা:৩০৬)
.
অপর ফাতাওয়ায় যখন ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল:আশআরিরা কি আহলে সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত?
জবাবে শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:الأشاعرة من أهل السنة والجماعة فيما وافقوا فيه أهل السنة والجماعة، وهم مخالفون لأهل السنة والجماعة في باب الصفات؛ لأنهم لا يثبتون من صفات الله إلا سبع صفات، ومع هذا لا يثبتونها على الوجه الذي أثبته عليه أهل السنة، فلا ينبغي أن نقول هم من أهل السنة على الإطلاق، ولا أن ننفي عنهم كونهم من أهل السنة على الإطلاق، بل نقول هم من أهل السنة، فيما وافقوا فيه أهل السنة وهم مخالفون لأهل السنة فيما خالفوا فيه أهل السنة.
“আশআরীরা যেসব বিষয়ে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের সাথে একমত, সেসব ক্ষেত্রে তারা আহলুস সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত। তবে সিফাতের অধ্যায়ে তারা আহলুস সুন্নাহর বিরোধিতা করেছে। কারণ তারা আল্লাহর সিফাতের মধ্যে মাত্র সাতটি সিফাত সাব্যস্ত করে। তাছাড়া সেগুলোকেও তারা সেই পদ্ধতিতে সাব্যস্ত করে না, যেভাবে আহলুস সুন্নাহ সাব্যস্ত করে। তাই একেবারে নিঃশর্তভাবে তাদেরকে আহলুস সুন্নাহ বলা উচিত নয়, আবার একেবারে নিঃশর্তভাবে তাদেরকে আহলুস সুন্নাহর বাইরে বলাও উচিত নয়। বরং বলা হবে যে বিষয়ে তারা আহলুস সুন্নাহর সাথে একমত, সে বিষয়ে তারা আহলুস সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত; আর যে বিষয়ে তারা বিরোধিতা করেছে,সে বিষয়ে তারা আহলুস সুন্নাহর বিরোধী।”(ইবনু উসামীন লিক্বাউল বাব আল-মাফতূহ, লিক্বা নং-৬)
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ফাদ্বীলাতুশ শাইখ, ইমাম মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী আদ-দিমাশক্বী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] বলেছেন,وأما الأشاعرة والماتريدية هل هم من أهل السنة والجماعة؟ أقول: هم من أهل السنة والجماعة في كثير من عقائدهم، ولكن في عقائد أخرى انحرفوا عن أهل السنة والجماعة، إما إلى الجبرية وإما إلى الانعزالية ونحو ذلك “আশআরী ও মাতুরীদীরা কি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের অন্তর্ভুক্ত? আমি বলি: তাদের বহু আকীদায় তারা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু কিছু আকীদায় তারা আহলুস সুন্নাহ থেকে বিচ্যুত হয়েছে কখনো জাবরিয়াদের দিকে, কখনো মু‘তাযিলাদের দিকে, অথবা এজাতীয় অন্যান্য ভ্রান্ত মতবাদের দিকে।”
.
পরিশেষে উপরোক্ত আলোচনা থেকে একথা পরিস্কার যে, আশ’আরী মতাদর্শের অনুসারীরা আহলুস সুন্নাহ কি না, তা নির্ভর করে ‘আহলুস সুন্নাহ’ পরিভাষার প্রয়োগের ওপর: অর্থাৎ আহলুস সুন্নাহ’ পরিভাষাটি যদি রাফেযী বা শিয়াদের বিপরীতে ব্যবহৃত হয় তবে আশ’আরীরা এর অন্তর্ভুক্ত, কিন্তু যদি সালাফে সালেহীনের বিশুদ্ধ আকিদার মাপকাঠিতে বিচার করা হয় তবে আল্লাহর সিফাত বা গুণাবলির অপব্যাখ্যা ও যুক্তিনির্ভর দর্শনের (ইলমুল কালাম) কারণে তারা সুন্নাহর মূলধারা থেকে বিচ্যুত। তাই ইনসাফপূর্ণ অবস্থান হলো—আশ’আরীরা যেসব বিষয়ে কুরআন ও সুন্নাহর অনুসারী সেসব ক্ষেত্রে তারা আহলুস সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত,আর যেসব বিষয়ে তারা সালাফদের আকিদা ও পদ্ধতির বিরোধিতা করেছে সেসব ক্ষেত্রে তারা আহলুস সুন্নাহর বহির্ভূত; অর্থাৎ তাদেরকে নিঃশর্তভাবে সুন্নাহর অনুসারী বা পুরোপুরি সুন্নাহর বাইরে—কোনোটিই বলা সঠিক নয়। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ওস্তায ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি সৌদি আরব।

একাধিক বিবাহের ১০০ টি উপকারিতা

 ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি।অতঃপর প্রিয় পাঠক ইসলামি শরিয়তে একাধিক বিবাহ কোনো বিলাসিতা বা নিছক শখের বিষয় নয়; বরং এটি এক মহান এবং কঠিন দায়িত্ব। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, যথাযথ শর্ত পূরণ করা এবং স্ত্রীদের মাঝে ইনসাফ কায়েম করা বর্তমান যুগের অধিকাংশ সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত দুরূহ একটি কাজ। তাই উপযুক্ত সামর্থ্য ও মানসিক প্রস্তুতি ছাড়া ঢালাওভাবে একে উৎসাহিত করার সুযোগ নেই। ​তবে মহান আল্লাহ যেহেতু বিশেষ প্রয়োজন ও প্রেক্ষাপটে একজন পুরুষের জন্য একই সাথে সর্বোচ্চ চারটি বিয়ে বৈধ রেখেছেন, সেহেতু মুমিন হিসেবে এর বিরোধিতা করার বা একে অপছন্দ করার কোনো অবকাশ নেই। বরং আল্লাহর প্রতিটি বিধানের প্রতি নিঃস্বার্থ আনুগত্য প্রদর্শন করাই প্রকৃত ইমানদারিত্বের পরিচয়। কারণ, এই বিধানের গভীরে লুকিয়ে আছে বহু সামাজিক, মানবিক ও চারিত্রিক কল্যাণ।​আজকের নিবন্ধে আমরা ইসলামের এই বিশেষ বিধানের পেছনে থাকা নানাবিধ ইতিবাচক দিক নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করব। আজ আমরা একাধিক বিবাহের ১০০টি ইতিবাচক ও কল্যাণকর দিক তুলে ধরব ইনশাআল্লাহ।” আজকের পোষ্টের হেডলাইন হলো: “একাধিক বিবাহের ১০০ টি উপকারিতা”

.
​(ক) জনতাত্ত্বিক দিক (জনসংখ্যা):
.
​১. টেকসই জন্মহার নিশ্চিতকরণ।
২. লিঙ্গানুপাতের ভারসাম্য রক্ষা।
৩. নিরবচ্ছিন্ন যুবশক্তির জোগান।
৪. দুর্যোগকালীন জনক্ষয় দ্রুত পূরণ।
৫. বংশীয় ও ভৌগোলিক বিস্তৃতি।
৬. বিবাহের আদর্শ বয়সকাঠামো বজায় রাখা।
৭. জনসংখ্যার বয়সভিত্তিক বিন্যাসের উন্নয়ন।
৮. সামাজিক বার্ধক্য বা জনমিতিক স্থবিরতা রোধ।
৯. সীমান্ত অঞ্চলে জনবসতি ও নিরাপত্তা জোরদার।
১০. শক্তিশালী ও সুবিশাল মানবসম্পদ গঠন।
.
​(খ) উম্মাহর শক্তি ও প্রাণচাঞ্চল্যের দিক:
.
​১. নববী (ﷺ) আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী উম্মাহর সংখ্যাধিক্য অর্জন।
২. কৌশলগত মানবিক গভীরতা (Strategic Depth) বৃদ্ধি।
৩. নিজস্ব আত্মপরিচয় ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ।
৪. সভ্যতার নিরবচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতা নিশ্চিতকরণ।
৫. আদর্শিক ও ভাষাগত শ্রেষ্ঠত্ব সুদৃঢ়করণ।
৬. বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন স্থাপন।
৭. বিশ্বমঞ্চে উম্মাহর প্রভাব ও গুরুত্ব বৃদ্ধি।
৮. গৌরবময় বংশীয় সোপান সংরক্ষণ।
৯. শেকড় ও ঐতিহ্যের প্রতি দায়বদ্ধতা।
১০. আন্তঃসীমান্ত সামাজিক সংহতি দৃঢ়করণ।
.
​(গ) রাজনৈতিক দিক:
.
​১. টেকসই সামাজিক স্থিতিশীলতা আনয়ন।
২. নেতৃত্বের গণভিত্তি ও জনসমর্থন সম্প্রসারণ।
৩. অবিবাহিত জনশক্তির ক্ষোভ ও অস্থিরতা নিরসন।
৪. রাষ্ট্রনায়কোচিত দক্ষ নেতৃত্বের বিকাশ।
৫. স্বনির্ভর ও দক্ষ কর্মীবাহিনী তৈরি।
৬. বৈবাহিক আত্মীয়তায় গোষ্ঠীগত বিবাদ মীমাংসা।
৭. প্রভাবশালী সামাজিক চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠী গঠন।
৮. পারিবারিক ঐক্যের মাধ্যমে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ।
৯. রাষ্ট্রীয় সমাজকল্যাণ খাতের ওপর চাপ হ্রাস।
১০. ইসলামী সামাজিক আইনের প্রায়োগিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শন।
.
​(ঘ) অর্থনৈতিক দিক:
.
​১. অভ্যন্তরীণ বাজার ও বাণিজ্যিক গতিশীলতা বৃদ্ধি।
২. আবাসন খাতের চাহিদা ও প্রবৃদ্ধি নিশ্চিতকরণ।
৩. শিক্ষা ও মানবসম্পদ খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি।
৪. অর্থপ্রবাহ ও তারল্যের বহুমুখী সঞ্চালন।
৫. শ্রমের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পুরুষকে উদ্বুদ্ধকরণ।
৬. পারিবারিক শিল্প ও প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশ্বস্ত জনবল।
৭. ভোগ ও সেবা খাতের টেকসই সম্প্রসারণ।
৮. পরনির্ভরশীলতা কমিয়ে স্বাবলম্বী সমাজ গঠন।
৯. সুসংহত ও বিস্তৃত পারিবারিক সম্পদ গড়ে তোলা।
১০. ভ্রাতৃপ্রতিম আর্থিক নিরাপত্তা বলয় তৈরি।
.
​(ঙ) ধর্মীয় ও শরয়ি দিক:
.
​১. সুন্নাহর বিলুপ্তপ্রায় বিধানের পুনর্জাগরণ।
২. অশ্লীলতামুক্ত নৈতিক সমাজ গঠন।
৩. পারিবারিক ব্যয়ে অবিরাম সাদাকার সওয়াব অর্জন।
৪. বিধবা ও অসহায় নারীদের মর্যাদাপূর্ণ পুনর্বাসন।
৫. উম্মাহর সংখ্যাগত শ্রেষ্ঠত্ব সুনিশ্চিতকরণ।
৬. ইনসাফ ও ন্যায়বিচারের ব্যবহারিক অনুশীলন।
৭. প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে মুজাহাদা ও নফস নিয়ন্ত্রণ।
৮. চারিত্রিক পবিত্রতা ও দৃষ্টির হিফাজত।
৯. উত্তরাধিকার ও আত্মীয়তার হকের সঠিক প্রয়োগ।
১০. দায়িত্বশীল কিওয়ামাহ বা অভিভাবকত্বের বিকাশ।
.
​(চ) মনস্তাত্ত্বিক দিক:
.
​১. একাকীত্ব ও নিঃসঙ্গতা দূরীকরণ।
২. পুরুষের মানসিক সজীবতা ও প্রাণচাঞ্চল্য বজায় রাখা।
৩. দাম্পত্য জীবনের একঘেয়েমি নিরসন।
৪. আত্মবিশ্বাস ও মানসিক দৃঢ়তা বৃদ্ধি।
৫. আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা (EQ) ও সহনশীলতার বিকাশ।
৬. নারীর মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক নিরাপত্তা।
৭. বৃহৎ পরিবেশে শিশুদের ব্যক্তিত্বের সুষম গঠন।
৮. দলগত সাহচর্যে মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ।
৯. স্বার্থহীনতা ও ত্যাগের মানসিকতা অর্জন।
১০. প্রশান্তি ও স্বস্তির বহুমুখী উৎস নিশ্চিতকরণ।
.
​(ছ) সামাজিক দিক:
.
​১. নারী ও পুরুষের অবিবাহিত থাকার সমস্যা নিরসন।
২. তালাকপ্রাপ্তা ও বিধবাদের সামাজিক একীভূতকরণ।
৩. সামাজিক ও নৈতিক অপরাধের হার হ্রাস।
৪. নারীদের পারস্পরিক সহায়তা ও সহমর্মিতা।
৫. আত্মীয়তার পরিধি ও সামাজিক নেটওয়ার্ক বৃদ্ধি।
৬. পারিবারিক শৃঙ্খলা ও শিষ্টাচারের উন্নয়ন।
৭. এতিম ও অনাথ শিশুদের সুরক্ষাবলয় তৈরি।
৮. নারীর মর্যাদা ও হিজাবের সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ।
৯. আভিজাত্যপূর্ণ সামাজিক প্রভাব বলয় তৈরি।
১০. পারিবারিক শ্রমের সুষম বণ্টনে কলহ নিরসন।
.
​(জ) সামরিক ও প্রতিরক্ষা দিক:
.
​১. অফুরন্ত লড়াকু জনশক্তির জোগান।
২. যুদ্ধের জনতাত্ত্বিক ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার সক্ষমতা।
৩. শারীরিক ও মানসিক বলিষ্ঠ প্রজন্ম গঠন।
৪. প্রতিরক্ষা খাতে জনবলের বৈচিত্র্য নিশ্চিতকরণ।
৫. স্বজন ও ভূখণ্ড রক্ষায় সর্বোচ্চ অনুপ্রেরণা।
৬. বৃহৎ পরিবারের মাধ্যমে শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ ফ্রন্ট।
৭. নজরদারি ও জননিরাপত্তা ব্যবস্থার দৃঢ়তা।
৮. জনসংখ্যাগত আগ্রাসন মোকাবিলায় শ্রেষ্ঠত্ব।
৯. শহীদের উত্তরসূরিদের সামাজিক ও পারিবারিক নিরাপত্তা।
১০. সংখ্যাতাত্ত্বিক শ্রেষ্ঠত্বের মাধ্যমে মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরক্ষা (Deterrence)।
.
​(ঝ) বংশগতি ও জৈবিক দিক:
.
​১. প্রজন্মান্তরে জেনেটিক বৈচিত্র্য আনয়ন।
২. বংশগত ও জন্মগত রোগের ঝুঁকি হ্রাস।
৩. চারিত্রিক ও শারীরিক গুণাবলীর উৎকর্ষ সাধন।
৪. উন্নত জিনের শ্রেষ্ঠত্ব ও ধারাবাহিকতা রক্ষা।
৫. মেধা ও প্রতিভা বিকাশের অনুকূল পরিবেশ।
৬. বিপন্ন বংশধারা ও আভিজাত্য টিকিয়ে রাখা।
৭. সুঠাম ও শক্তিশালী জনসমষ্টির প্রসার।
৮. রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন ও স্বাস্থ্যবান উম্মাহ।
৯. পারিবারিক পর্যায়ে জৈবিক ভিন্নতার সমৃদ্ধি।
১০. বিশুদ্ধ বংশমর্যাদা ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ।
.
​(ঞ) সাধারণ ও কৌশলগত সুবিধা:
.
​১. খেলাফতের বিস্তার ও পৃথিবী আবাদের লক্ষ্য পূরণ।
২. সাম্রাজ্যবাদী জন্মনিয়ন্ত্রণ নীতির কার্যকর মোকাবিলা।
৩. শক্তিশালী পারিবারিক অর্থনৈতিক ভিত্তি স্থাপন।
৪. পুরুষের নেতৃত্ব ও ব্যবস্থাপনা দক্ষতার উন্নয়ন।
৫. বৈবাহিক বন্ধনে জাতীয় সংহতি সুদৃঢ়করণ।
৬. ইসলামী শরীয়াহর কালোত্তীর্ণ উপযোগিতা প্রমাণ।
৭. কর্মতৎপর ও প্রাণবন্ত সামাজিক কাঠামো।
৮. বিদেশি শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আত্মনির্ভরতা।
৯. মানবসম্পদে স্বয়ংসম্পূর্ণ জাতি গঠন।
১০. অপসংস্কৃতি রুখতে ‘যৌথ পরিবার’ মডেলের পুনরুজ্জীবন। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
____________________
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

মানত সম্পর্কে বিস্তারিত

 প্রশ্ন: মানত কী? শরীয়তে মানতের বিধান কী? মানত কত প্রকার ও কি কি? মানত পূরণ করার বিধান কি?

▬▬▬▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর:মানত সংক্রান্ত পুরো বিষয়টি আমরা ধারাবাহিক ভাবে পয়েন্ট আকারে উল্লেখ করব ইনশাআল্লাহ।
.
মানত কী?
.
মানতের আরবি শব্দ হচ্ছে (نذر (নযর) যার বাংলা অর্থ হচ্ছে: নিজের দায়িত্বে নেয়া।অর্থাৎ যা নিজের দায়িত্ব নয় তা নিজের জন্য অপরিহার্য করে নেয়া। আসফাহানী (রাহিমাহুল্লাহ) ‘মুফরাদাতু আলফাযিল কুরআন’ গ্রন্থে (পৃ. ৭৯৭) বলেন: মানত হচ্ছে— কোনো কিছু ঘটার সাথে আপনি নিজের উপর এমন কিছু করা আবশ্যক করে নেয়া; যা আবশ্যক নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:إِنِّي نَذَرْتُ لِلرَّحْمَنِ صَوْمًا “আমি আর-রহমানের (আল্লাহর) জন্য রোযা মানত করেছি।”(সূরা মারইয়াম: ২৬) সুতরাং মানত হচ্ছে শরীয়তের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি নিজের উপর কোনো কিছু আবশ্যক করা, হোক সেটি (তৎক্ষণাৎ) কার্যকর কিংবা (কিছুর সাথে) শর্তযুক্ত। আল্লাহর কিতাবে মানতকে প্রশংসার স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা মুমিন বান্দাদের ব্যাপারে বলেন:إِنَّ الْأَبْرَارَ يَشْرَبُونَ مِن كَأْسٍ كَانَ مِزَاجُهَا كَافُورًا عَيْنًا يَشْرَبُ بِهَا عِبَادُ اللَّهِ يُفَجِّرُونَهَا تَفْجِيرًا يُوفُونَ بِالنَّذْرِ وَيَخَافُونَ يَوْمًا كَانَ شَرُّهُ مُسْتَطِيرًا “সৎকর্মশীলরা এমন এক পেয়ালা থেকে পান করবে (যার শরাবে) কাফূরের মিশ্রণ থাকবে। এমন একটি ঝরনা যা থেকে আল্লাহর বান্দারা পান করবে এবং তারাই একে যথাযথভাবে (নিজেদের সুবিধামত) প্রবাহিত করবে। তারা (তাদের) মানত পূরণ করে (কর্তব্য পালন করে) এবং এমন একটি দিনকে ভয় করে যার অনিষ্ট হবে ব্যাপক।”[সূরা দাহর: ৫-৭] কিয়ামতের দিনের ভয়াবহতার ব্যাপারে তাদের শঙ্কা এবং মানত পূরণ করাকে আল্লাহ তাআলা তাদের নাজাত লাভ ও জান্নাতে প্রবেশের অন্যতম কারণ হিসেবে গণ্য করেছেন।
.
শরীয়তে মানতের বিধান:
.
ইসলামে (নযর) মানত করাকে নিরুৎসাহিত করেছে। আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআতের অধিকাংশ ইমাম ও ফিকহবিদের অভিমত অনুসারে (নযর) মানত করা মাকরূহ বা অপছন্দনীয় কাজ।কারন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানত করতে নিষেধ করেছেন। আর মানত আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত ভাগ্যকে পরিবর্তন করতে পারে না।বরং এটি কৃপণের সম্পদ থেকে কিছু অংশ বের করে আনে মাত্র।যেমন: রাসূল (ﷺ) বলেছেন:لَا تَنْذُرُوا فَإِنَّ النَّذْرَ لَا يُغْنِي مِنَ الْقَدَرِ شَيْئًا وَإِنَّمَا يُسْتَخْرَجُ بِهِ من الْبَخِيل”তোমরা মানৎ করো না। কেননা মানৎ তাকদীরের কোনই পরিবর্তন করতে পারে না। অবশ্য এর দ্বারা কৃপণের ব্যয়-নির্বাহ হয় মাত্র”।(সহীহ বুখারী হা/ ৬৬০৯,সহীহ মুসলিম হা/১৬৪০) অপর বর্ননায় তিনি (ﷺ) আরো বলেছেন:النَّذْرُ لاَ يُقَدِّمُ شَيْئًا وَلاَ يُؤَخِّرُهُ وَإِنَّمَا يُسْتَخْرَجُ بِهِ مِنَ الْبَخِيلِ ‏ “মানত কোনো কিছুকে আগেও করে না, পিছেও করে না। বরং এর দ্বারা কেবল কৃপণ ব্যক্তি থেকে বের করা হয়।”(সহীহ মুসলিম হা/৪৩২৬)
.
তবে হা! ইসলাম মানত করার ব্যাপারে অনুৎসাহিত করা হলেও বৈধ কাজের মানত করা হলে তা পূরণ করা আবশ্যক। যেমন কেউ যদি কোন ইবাদত বা নেক আমল করার মানত করলে সেটা পূর্ণ করা ওয়াজিব। কারণ আল্লাহ তাআলা বলেন:ثُمَّ لْيَقْضُوا تَفَثَهُمْ وَلْيُوفُوا نُذُورَهُمْ“তারপর তারা যেন তাদের ময়লাগুলো দূর করে এবং মানতগুলো পূরণ করে।”[সূরা হজ্জ: ২৯] ইমাম শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: নির্দেশ ওয়াজিব সাব্যস্ত করে। পাশাপাশি শর্তযুক্ত মানতের উদাহরণ হলো: কেউ যদি বলে:কেউ একদিন বা দুইদিন রোযা রাখার মানত করল,আবার কোনও অসুস্থ ব্যক্তি মানত করে আমি যদি সুস্থ হই তাহলে একটি উমরাহ পালন করব।কিংবা কেউ যদি বলে: ‘আল্লাহ যদি আমার রোগীকে সুস্থ করে দেন, তাহলে আমি অমুক ব্যক্তিকে ওমরায় পাঠাবো।এখানে মানতের বিষয়টি শরিয়ত অনুমোদিত একটি ইবাদত ও আল্লাহর আনুগত্যের বিষয়।মানতের শর্ত পূরণ হলে এ মানত পূর্ণ করা ওয়াজিব।কারণ এটি একটি আনুগত্যের মানত। হাদিসে এসেছে: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী: (مَن نذر أن يطيع الله فليطعه )”যে ব্যক্তি আল্লাহ্‌র কোন আনুগত্য করার মানত করল তাকে ঐ আনুগত্য পালন করতে হবে।”(সহিহ বুখারী হা/৬৩১৮) শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া বলেছেন: لو نذر أن يأتي المسجد الحرام لحج أو عمرة؛ فإن هذا يلزمه بلا نزاع.”যদি কেউ মানত করে যে, সে হজ বা উমরার জন্য মসজিদুল হারামে যাবে, তবে এটি তার জন্য অবশ্যই পালনীয়—এ ব্যাপারে কোনো দ্বিমত নেই।”(মাজমু’ আল-ফাতাওয়া” ২৭তম খণ্ড;পৃষ্ঠায়;৩৩৪)
.
প্রশংসনীয় ও নিষিদ্ধ মানতের মধ্যকার পার্থক্য:
কেউ যদি বলে: মানত পূরণকারীদের প্রশংসা করার পর আবার কীভাবে তা করতে নিষেধ করা হয়? তাহলে এর উত্তর হলো: প্রশংসনীয় মানত হচ্ছে কোনো কিছুর সাথে শর্তযুক্ত না করে নিছক আনুগত্যমূলক মানত। মানুষ নিজেকে আনুগত্যমূলক কাজে বাধ্য করতে এবং অলসতা থেকে নিবৃত করতে কিংবা নিয়ামতের শুকরিয়া হিসেবে এ ধরনের মানত করে থাকে।অন্যদিকে নিষিদ্ধ মানত কয়েক প্রকার। তন্মধ্যে রয়েছে: কোনো কিছুর বিনিময়মূলক মানত, যেখানে মানতকারী আনুগত্যকে কোনো কিছু প্রাপ্তি কিংবা প্রতিহত করার সাথে শর্তযুক্ত করে রাখে; ফলে সে ঐ বস্তু না পেলে সে আনুগত্যমূলক কাজটি করে না। এ ধরনের মানতের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য। সম্ভবতঃ এই নিষেধাজ্ঞায় নিহিত প্রজ্ঞা নিম্নরূপ:
.
(১).মানতকারী অনীহা নিয়ে মানত পূরণ করে; যেহেতু এটি হঠাৎ করে তার উপর আবশ্যক হয়ে গিয়েছে।
.
(২).মানতকারী যখন কোনো কিছু প্রাপ্তির শর্তে (আল্লাহর) নৈকট্যমূলক কাজ করার মানত করেছে, তখন তার এই মানত হয়ে পড়েছে বিনিময়; যা নৈকট্য অর্জনকারীর নিয়তে সমস্যা সৃষ্টি করে। যেমন: তার রোগী সুস্থ না হলে সুস্থতার সাথে সে যে পরিমাণ দান করাকে শর্তযুক্ত করেছিল সেটি সে করবে না। আর এটি কৃপণ ব্যক্তির অবস্থা। এই ব্যক্তি তাৎক্ষণিক বিনিময় ছাড়া নিজের সম্পদ থেকে কিছু দেয় না। সাধারণত সে যে পরিমাণ নিজ সম্পদ থেকে দান করে থাকে, তার থেকে অতিরিক্ত পরিমাণ কেবল সে এই বিনিময়ের কারণেই প্রদান করে থাকে।
.
(৩).কিছু মানুষের এ ধরনের জাহেলী বিশ্বাস আছে যে, সে যে উদ্দেশ্যে মানত করেছিল সেটি মানত করার কারণেই পূরণ হবে অথবা আল্লাহ মানতকারীকে তার মানতের জন্য উদ্দেশ্য পূরণ করে দিবেন।
.
(৪).কিছু অজ্ঞ ব্যক্তির মনে থাকা এক ধরনের বিশ্বাস নাকচ করা। সে বিশ্বাসটি হচ্ছে: মানত তাকদীরকে প্রতিহত করে অথবা তার জন্য তৎক্ষণাৎ ভালো কিছু নিয়ে আসে অথবা মন্দ কিছু দূর করে দেয়। অজ্ঞ ব্যক্তির এমন বিশ্বাসের আশঙ্কায় মানতকে নিষেধ করা হয়েছে। পাশাপাশি এ ধরনের বিশ্বাস আকীদার বিশুদ্ধতার ক্ষেত্রে কতটা ভয়াবহ সেটির দিকে সতর্ক করাও এর উদ্দেশ্য।
.
পূরণ করা ওয়াজিব হওয়ার বিবেচনা থেকে মানতের প্রকারভেদ:
(১). যে মানত পূরণ করা আবশ্যক (আনুগত্যের মানত): যে মানত আল্লাহর আনুগত্যে হয়ে থাকে। যেমন: নামায, রোযা, উমরা, হজ্জ, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা, ইতিকাফ, জিহাদ, সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ। যেমন: যদি সে বলে, আমার উপর আল্লাহর জন্য এই পরিমাণ রোযা রাখা বা এই পরিমাণ দান করা আবশ্যক। কিংবা যদি সে বলে, আমার উপর আল্লাহর জন্য এই বছর হজ্জ করা আবশ্যক অথবা আল্লাহ আমার রোগীকে সুস্থ করার যে নিয়ামত দিয়েছেন তার কৃতজ্ঞতাস্বরূপ এ বছর মসজিদে হারামে দুই রাকাত নামায পড়া আমার উপর আবশ্যক। অথবা শর্তযুক্ত মানত; যেমন: কেউ যদি আল্লাহর নৈকট্যমূলক কোনো নেকীর কাজ করার মানত করে, তবে সেটা কোনো উপকারপ্রাপ্তির সাথে শর্তযুক্ত করে; যদি উপকারটি লাভ হয় সে নেকীর কাজটি করবে। উদাহরণস্বরূপ কেউ এভাবে বলা: যদি আমার হারানো ব্যক্তি ফিরে আসে অথবা যদি আল্লাহ আমাকে আমার শত্রুর অনিষ্ট থেকে রক্ষা করেন তাহলে এতটি রোজা রাখা বা এ পরিমাণ সদকা করা আমার উপর আবশ্যক। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “কেউ যদি মানত করে যে সে আল্লাহর আনুগত্য করবে, সে যেন তার আনুগত্য করে। আর কেউ যদি মানত করে যে তার অবাধ্যতা করবে, সে যেন তার অবাধ্যতা না করে।”[হাদীসটি বুখারী (৬২০২) বর্ণনা করেন]
মাওযূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ আল-কুয়েতিয়াহ, কুয়েতি ফিক্বহ বিশ্বকোষ, গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে:” اتفق الفقهاء على جواز تعليق النذر بالشرط , ولا يجب الوفاء قبل حصول المعلق عليه ; لعدم وجود سبب الوفاء , فمتى وجد المعلق عليه وجد النذر ولزم الوفاء به “ফকিহগণ একমত যে, শর্তযুক্ত মান্নত করা জায়েজ। তবে, যে শর্তের ওপর মান্নত নির্ভরশীল, তা পূর্ণ হওয়ার আগে মান্নত আদায় করা আবশ্যক নয়; কেননা, তখনো মান্নত আদায়ের কারণ অস্তিত্বে আসেনি। ফলে, যখন শর্ত পূর্ণ হবে, তখনই মান্নত কার্যকর হবে এবং তা পূরণ করা ওয়াজিব হবে।”(আল মাওযূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ; খণ্ড: ১২; পৃষ্ঠা: ৩১৫) হানাফি মাযহাবের আলেম ইমাম কাসানি’ বলেন: ” وإن كان معلقاً – أي : النذر – بشرط نحو أن يقول : إن شفى الله مريضي ، أو إن قدم فلان الغائب ، فلله عليّ أن أصوم شهراً أو أصلي ركعتين أو أتصدق بدرهم ، ونحو ذلك فوقته وقت الشرط ، فما لم يوجد الشرط ، لا يجب ؛ بالإجماع “যদি নজর কোনো শর্তের সাথে সম্পৃক্ত হয়, যেমন কেউ বলে— ‘যদি আল্লাহ আমার রোগীকে সুস্থ করেন’ অথবা ‘আমার অমুক প্রবাসী ফিরে এলে, তাহলে আমার উপর এক মাস রোযা রাখা, দুই রাকাত নামাজ আদায় করা বা এক দিরহাম সদকা করা ওয়াজিব হবে’, তাহলে এই নজরের সময় সেই শর্ত পূরণের পরই শুরু হবে। তাই শর্ত পূরণের আগে এটি পালন করা বাধ্যতামূলক নয়; এ বিষয়ে সর্বসম্মত মত রয়েছে।”(বাদায়েউস সানায়ি; খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ৯৪)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] ব্যথা কমার শর্তে মানত করা হলে সেটি কখন পূরণ করতে হবে এমন প্রশ্ন করা হলে জবাবে শাইখ :বলেছেন” إذا وجد الشرط المذكور وهو خفة الألم، فالواجب عليك الوفاء بالنذر فور”যদি (মানতের) উল্লিখিত শর্তটি পূর্ণ হয়,অর্থাৎ ব্যথা কমে যায়,তাহলে মানতকারীর উপর তার মানত অবিলম্বে পালন করা বাধ্যতামূলক…”(মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ, খণ্ড/২২; পৃষ্ঠা: ১৬৬)
.
আবার কেউ যদি আল্লাহর আনুগত্যমূলক কোনো মানত করে, তারপর এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয় যা তার মানত পূরণে প্রতিবন্ধক হয়; যেমন: সে যদি এক মাস রোযা রাখা অথবা হজ্জ করা অথবা উমরা করার মানত করে কিন্তু কোনো রোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণে রোযা রাখা, হজ্জ করা অথবা উমরা করতে অক্ষম হয় কিংবা দান করার মানত করে, কিন্তু দরিদ্র হয়ে যায় ফলে মানত পূরণ করার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলে, তাহলে সে মানতের কাফ্‌ফারা হিসেবে শপথ ভঙ্গের কাফ্‌ফারা দিবে। যেমনটি ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন: “কেউ যদি এমন কোনো মানত করে যা পূরণ করতে সে সক্ষম নয়, তাহলে এর কাফফারা হলো শপথ ভঙ্গের কাফ্‌ফারা।”[হাদীসটি আবু দাউদ বর্ণনা করেন। হাফেয ইবনে হাজার বুলুগুল মারাম গ্রন্থে বলেন: হাদীসটির সনদ সহীহ। হাদীসের হাফেযরা বর্ণনাটি মাওকূফ (সাহাবী থেকে বর্ণিত) হওয়ার মতটি প্রাধান্য দিয়েছেন] শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ ‘আল-ফাতাওয়া’ গ্রন্থে বলেন: ‘কোনো ব্যক্তি যদি আল্লাহর কোনো আনুগত্য করার মানত করে তাহলে তার উচিত এই মানত পূরণ করা। কিন্তু, যদি আল্লাহর জন্য কৃত মানত পূরণ না করে তাহলে অধিকাংশ সালাফের মতে সে শপথভঙ্গের কাফফারা দিবে।”(আল-ফাতাওয়া: ৩৩/৪৯)
.
(২). যে মানত পূরণ করা জায়েয নেই, আর এতে রয়েছে শপথভঙ্গের কাফ্‌ফারা। এ প্রকার মানতে অন্তর্ভুক্ত হবে:
▪️পাপের মানত: এটি এমন সব মানত যা আল্লাহর অবাধ্যতার অন্তর্ভুক্ত। যেমন: কবর বা মাজারে তেল, মোমবাতি বা খরচ দেওয়ার মানত করা, শির্কপূর্ণ কবর বা মাজার যিয়ারতের মানত করা। এটি কিছু দিক থেকে মূর্তির উদ্দেশ্যে মানত করার অনুরূপ। তদ্রূপ কেউ যদি কোনো গুনাহ করার মানত করে, যেমন: ব্যভিচার করা, মদ পান করা, চুরি করা, এতিমের সম্পদ ভক্ষণ করা, কারও হক অস্বীকার করা কিংবা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা (যেমন: কোনো শরয়ি কারণ ছাড়াই নির্দিষ্ট কোনো আত্মীয়ের সাথে কথা না বলা বা তার বাড়িতে প্রবেশ না করা)। এ সব মানত কোনো অবস্থাতেই পূরণ করা বৈধ নয়। বরং এর জন্য শপথের কাফফারা আদায় করতে হবে। এ ধরনের মানত পূরণ নিষিদ্ধ হওয়ার প্রমাণ হলো: আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত হাদীস, তিনি বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যে আল্লাহর আনুগত্য করার মানত করে সে যেন তা পালন করে। আর যে আল্লাহর অবাধ্যতা করার মানত করে সে যেন তা না করে।”[হাদীসটি বুখারী বর্ণনা করেন] ইমরান ইবনে হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “গুনাহের কাজে কোনো মানত পূরণ নেই।”(সহীহ মুসলিম হা/৩০৯৯)
▪️প্রত্যেক যে মানত শরঈ দলিলের সাথে সাংঘর্ষিক: কোনো মুসলিম যদি মানত করে এবং পরে তার কাছে স্পষ্ট হয় যে তার মানতটি কোনো শরয়ি সহীহ ও স্পষ্ট দলিলের সাথে সাংঘর্ষিক, তখন তার জন্য মানত পূরণ থেকে বিরত থাকা ও শপথের কাফফারা আদায় করা অনিবার্য।এর পক্ষে দলীল হচ্ছে, বুখারীতে বর্ণিত হাদীস: যিয়াদ ইবনে জুবাইর বলেন: আমি ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে ছিলাম। এক ব্যক্তি তাকে জিজ্ঞেস করে বলল: ‘আমি সারা জীবন প্রতি মঙ্গলবার বা বুধবার রোযা রাখার মানত করেছি। আজকের দিনটি কুরবানির দিন পড়ে গেছে।’ তিনি বললেন: ‘আল্লাহ মানত পূরণের আদেশ দিয়েছেন এবং আমাদেরকে কুরবানির দিনে রোযা রাখতে নিষেধ করা হয়েছে।’ লোকটি আবার জিজ্ঞেস করল, তিনি একই উত্তর দিলেন। অতিরিক্ত কিছু বললেন না।(সহীহ বুখারী হা/৬২১২)
ইমাম আহমদ (রাহিমাহুল্লাহ) বর্ণনা করেন, যিয়াদ ইবনে জুবাইর বর্ণনা করেন: ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু মিনায় হেঁটে যাচ্ছিলেন এর মধ্যে এক ব্যক্তি তাকে জিজ্ঞেস করল: ‘আমি সারা জীবন প্রতি মঙ্গলবার বা বুধবার রোযা রাখার মানত করেছি। আজকের এই দিনটি কুরবানির দিনে পড়ে গেছে। এ ব্যাপারে আপনার মতামত কী?’ তিনি বললেন: ‘আল্লাহ মানত পূরণের আদেশ দিয়েছেন, আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানীর দিনে রোযা রাখতে নিষেধ করেছেন কিংবা (বলেছেন) আমাদেরকে কুরবানির দিনে রোযা রাখতে নিষেধ করা হয়েছে।’ লোকটি মনে করল যে তিনি প্রশ্নটি শোনেননি। সে আবার জিজ্ঞেস করল: ‘আমি সারা জীবন প্রতি মঙ্গলবার বা বুধবার রোযা রাখার মানত করেছি। আজকের এই দিনটি কুরবানির দিনে পড়ে গেছে। তখন তিনি বললেন: ‘আল্লাহ মানত পূরণ করার আদেশ দিয়েছেন, আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানীর দিনে রোযা রাখতে নিষেধ করেছেন কিংবা (বলেছেন) আমাদেরকে কুরবানির দিনে রোযা রাখতে নিষেধ করা হয়েছে।’ পাহাড়ে ওঠার আগ পর্যন্ত তিনি অতিরিক্ত কিছু বলেননি। হাফেয ইবনে হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: ‘এ বিষয়ে ইজমা (সর্বসম্মত মত) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিনে নফল কিংবা মানত কোনো প্রকার রোযা রাখাই বৈধ নয়।’
.
▪️যে মানতের বিধান শপথের কাফফারা ছাড়া অন্য কিছু নয়: কিছু মানত আছে যেগুলোর ক্ষেত্রে মানতকারীর উপর কেবল শপথের কাফফারাই ওয়াজিব হয়। এমন মানতের মধ্যে রয়েছে:
▪️উন্মুক্ত মানত (যে মানতে মানতকৃত বিষয় উল্লেখ করা হয়নি): কোন মুসলিম যদি মানত করে, কিন্তু কী মানত করেছে তা উল্লেখ না করে বা নির্দিষ্ট না করে উন্মুক্ত রেখে দেয়; যেমন এভাবে বলা: আল্লাহ যদি আমার রোগ সারিয়ে দেন তাহলে আমার উপর আল্লাহর জন্য একটি মানত আবশ্যক, কিন্তু কোনো কিছু নির্দিষ্ট না করে, তাহলে তার উপর শপথের কাফফারা ওয়াজিব হবে।উকবা ইবনে আমির রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: “মানতের কাফফারা হলো শপথের কাফফারা।”[হাদীসটি ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেন] ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: মালেক ও অধিকাংশ আলেম এটিকে উন্মুক্ত মানতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলেছেন; যেমন: কেউ বলল: আমার উপর একটি মানত আবশ্যক।(নববী;শরহে মুসলিম: ১১/১০৪)
.
▪️যে মানতে মানত পূরণ করা বা কাফফারা দেয়া, এ দু’টোর মধ্যে কোনো একটি বেছে নেওয়ার সুযোগ আছে: কিছু মানত আছে যেগুলো পূরণ করা কিংবা শপথের কাফ্‌ফারা দেওয়া উভয়টির মাঝে যে কোনো একটি বাছাইয়ের সুযোগ আছে। এ ধরনের মানতের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত:
১. জিদ বা রাগের মানত: এটি এমন প্রত্যেক মানত যা শপথের মতো কোনো কাজ করতে উৎসাহ দিতে বা বাধা দিতে, সত্যায়ন করতে বা অস্বীকার করতে করা হয়। মানতকারী মানতকে উদ্দেশ্য করে না বা আল্লাহর নৈকট্য অর্জনকে উদ্দেশ্যে করে না। যেমন: রাগের সময় কেউ এভাবে বলা: ‘আমি যদি এটা করি তবে আমার ওপর হজ করা আবশ্যক’ বা ‘এক মাস রোযা রাখা আবশ্যক’ বা ‘এক হাজার দিনার সদকা করা আবশ্যক’ অথবা যদি বলে: ‘আমি যদি অমুকের সাথে কথা বলি তবে আমার এই দাসকে মুক্ত’ বা ‘আমার স্ত্রী তালাক’ ইত্যাদি। এরপর সে কাজটি করে ফেলে। অথচ এ কথাগুলো বলার পিছনে তার উদ্দেশ্য ছিল কেবল কাজটি না করার ব্যাপারে দৃঢ়তা প্রকাশ করা; অন্যকিছু নয়। তার প্রকৃত উদ্দেশ্য শর্তকৃত কাজটি না করা এবং ফলাফলও কার্যকর না করা। এ ধরনের মানতে মানতকারীকে দুইটির কোনো একটি করার অবকাশ দেওয়া হয়: (মানত পূরণ করা কিংবা শপথের কাফফারা আদায় করা)।
২. যে মানতের অবস্থা হচ্ছে তর্ক-বিতর্ক কিংবা যে মানতের উদ্দেশ্য কোনো কিছু করা বা না করার প্রতি উৎসাহ প্রকাশ করা (মানত পূরণ করা কিংবা মানতের বদলে শপথের কাফ্‌ফারা দেওয়া; বিষয়টিকে মূলতঃ মানত হিসেবে গণ্য করে)। ইবনে তাইমিয়া বলেন: ‘যদি মানতকে শপথের মত করে শর্তযুক্ত করে; যেমন এভাবে বলল: ‘আমি যদি তোমাদের সাথে সফর করি তাহলে আমার ওপর হজ করা অনিবার্য’ বা ‘আমার সম্পদ সদকা’ বা ‘দাস মুক্ত’, তবে এটি সাহাবায়ে কেরাম ও জমহুর আলেমের মতে মানতের শপথ; মানত নয়। তাই সে নিজের উপর যা অনিবার্য করেছে সেটা যদি পূরণ না করে; তবে শপথের কাফফারা দেয়াই যথেষ্ট।” তিনি অন্য স্থানে বলেন: “আমাদের মতে জিদ ও রাগের মানতের ক্ষেত্রে দুটো বিষয়ের কোনটি করতে পারবে: কাফফারা দেওয়া কিংবা শর্তযুক্ত কাজটি করা। যদি সে শর্তযুক্ত অনিবার্যকৃত কাজটি না করে, তাহলে কাফফারা ওয়াজিব হবে।”
৩. বৈধ বিষয়ে মানত করা: এটি এমন মানত যা বৈধ কাজের সাথে সম্পর্কিত। যেমন নির্দিষ্ট পোশাক পরা, নির্দিষ্ট খাবার খাওয়া, নির্দিষ্ট বাহনে চড়া, নির্দিষ্ট ঘরে প্রবেশ করা ইত্যাদি।সাবিত ইবনে দাহহাক থেকে বর্ণিত: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে এক ব্যক্তি বুওয়ানাহ নামক স্থানে উট জবাই করার মানত করেছিল (এক বর্ণনায় আছে: তার পুত্র সন্তান জন্মানোর কারণে)। তখন সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বলল: ‘আমি বুওয়ানাহতে উট জবাই করার মানত করেছি।’ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন: “সেখানে কি জাহেলিয়াতের কোনো মূর্তি পূজিত হতো?” তারা বলল: ‘না।’ তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন: “সেখানে কি তাদের কোনো উৎসব হতো?” তারা বলল: ‘না।’ তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: “তোমার মানত পূরণ করো; কারণ আল্লাহর অবাধ্যতামূলক কোনো মানত পূরণ করা যায় না এবং এমন কোনো মানত পূরণ করা যায় না যা আদম সন্তানের মালিকানায় নেই।”(আবু দাউদ হা/২৮৮১) এই ব্যক্তি পুত্র সন্তান লাভের কারণে আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া আদায় করে (ইয়াম্বুর পেছনে) বুওয়ানাহ নামক স্থানে উট জবাই করার মানত করেছিল। তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সেখানে মানত পূরণের অনুমতি দিয়েছিলেন।
.
পরিশেষে, আমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি যেন আমাদেরকে তাঁর পছন্দনীয় ও সন্তোষজনক কাজ করার তৌফিক দান করেন। নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দুরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক।গৃহীত ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-২৫৮৭)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

Translate