Friday, May 1, 2026

বিয়ের জন্য পাত্রী দেখার ক্ষেত্রে শরিয়তের সীমা কতটুকু

 বিয়ের জন্য পাত্রী দেখার ক্ষেত্রে শরিয়তের সীমা কতটুকু? [আল্লামা শায়খ মুহাম্মাদ ইবনে সালেহ আল উসাইমিন (রাহ.)]

প্রশ্ন: বিবাহের প্রস্তাবের পর পাত্রী দেখার শরিয়তসম্মত সীমা কী? তার চুল, মুখ ও হাত দেখা কি জায়েজ?
উত্তর: পাত্রী দেখা জায়েজ। তবে কিছু শর্ত আছে। যেমন:
◈ প্রথম শর্ত: বিয়ের দৃঢ় ইচ্ছা নিয়ে প্রস্তাব করতে হবে।
◈ দ্বিতীয় শর্ত: মনে প্রবল ধারণা থাকতে হবে যে প্রস্তাব গৃহীত হবে।
◈ তৃতীয় শর্ত: কোনো যৌন আকাঙ্ক্ষার বশে দেখা যাবে না।
◈ চতুর্থ শর্ত: নির্জনে একা দেখা যাবে না।
এই শর্তগুলোর যেকোনো একটি না মানলে দেখা হারাম বলে গণ্য হবে। (আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন)।
পাত্রের জন্য পাত্রীর যতটুকু দেখা বিয়ের আগ্রহ জাগায় ততটুকু দেখা জায়েজ — যেমন: মুখ, চুল, গলা, দুই হাত ও পা। কারণ এগুলো দেখে পাত্র সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
❑ প্রশ্ন: ফোনে কথা বলা কি জায়েজ?
উত্তর: না। অনেক পাত্র বিয়ের প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার পর প্রতি রাতে বিয়ের আগেই ফোনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলে — এটা হারাম। কারণ এই ধরনের কথোপকথনে যৌন অনুভূতি জেগে ওঠা অনিবার্য। কেউ কেউ বলে, “আমি তার মেধা ও কথা বলার ধরন বোঝার জন্য কথা বলি” — কিন্তু এই যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ বিয়ের আগে বাগদত্তা মেয়েটি শরিয়তের দৃষ্টিতে পুরোপুরি একজন পরনারী।
❑ প্রশ্ন: পাত্রের সামনে পাত্রী কি মেকআপ করে আসতে পারবে?
উত্তর: না, জায়েজ নেই। কারণ এখনো সে তার স্ত্রী হয়নি। তা ছাড়া মেকআপ করে আসলে পাত্র যদি পরবর্তীতে আসল চেহারা দেখে হতাশ হয় তাহলে সে বলবে “এই মেয়ে ধোঁকা দিয়েছে।” তাই স্বাভাবিক চেহারায় আসাই উচিত।
❑ প্রশ্ন: সুন্দর পোশাক পরে আসা কি জায়েজ?
উত্তর: না। সে এখনো তার স্ত্রী নয়। তাই সাধারণ পোশাকে আসবে ━ কোনো সাজসজ্জা ছাড়া।
❑ প্রশ্ন: সুগন্ধি ব্যবহার করে আসা কি জায়েজ?
উত্তর: না। কারণ শরিয়তের দৃষ্টিতে সে এখনো পরনারী।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

কুরআন ও সুন্নাহ নাকি আহলে বাইত কোনটি অনুসরণীয়

 কুরআন ও সুন্নাহ নাকি আহলে বাইত (নবী পরিবার)-কোনটি অনুসরণীয়? বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারীদের ব্যাপারে সচেতন হোন!!

প্রশ্ন: আমি জানি, রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদেরকে পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরতে বলেছেন। কিন্তু হঠাৎ একদিন দেখলাম, মুসলিম শরিফের হাদিসে বলা আছে, পবিত্র কুরআন ও আহলে বায়তকে অনুসরণ করতে। তাহলে সুন্নাহ নাকি আহলে বায়েতকে অনুসরণ করব? বিষয়টি নিয়ে আমি খুবই দ্বিধাগ্রস্ত । দয়া করে আমাকে সঠিক বিষয়টি জানাবেন। জাযাকাল্লাহ খাইরান।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর: রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) অনেক হাদিসে আল্লাহর কিতাব ও রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার আদেশ করেছেন। আর সহিহ মুসলিমের উক্ত হাদিসে আল্লাহর কিতাব আঁকড়ে ধরার নির্দেশ দেওয়ার পর আহলে বাইত তথা নবী পরিবারের অধিকার ও তাদের প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। সেখানে তাদেরকে অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়নি।
সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হাদিসটি দেখুন:
انطَلَقتُ أَنَا وَحُصَيْنُ بْنُ سَبْرَةَ وَعُمَرُ بْنُ مُسْلِمٍ إِلَى زَيْدِ بْنِ أَرْقَمَ، فَلَمَّا جَلَسْنَا إِلَيْهِ قَالَ لَهُ حُصَيْنٌ: لَقَدْ لَقِيتَ يَا زَيْدُ خَيْرًا كَثِيرًا؛ رَأَيْتَ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَسَمِعْتَ حَدِيثَهُ، وَغَزَوْتَ مَعَهُ، وَصَلَّيْتَ خَلْفَهُ، لَقَدْ لَقِيتَ يَا زَيْدُ خَيْرًا كَثِيرًا! حَدِّثْنَا يَا زَيْدُ مَا سَمِعْتَ مِنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: يَا ابْنَ أَخِي، وَاللهِ لَقَدْ كَبِرَتْ سِنِّي، وَقَدُمَ عَهْدِي، وَنَسِيتُ بَعْضَ الَّذِي كُنْتُ أَعِي مِنْ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَمَا حَدَّثْتُكُمْ فَاقْبَلُوا، وَمَا لَا فَلَا تُكَلِّفُونِيهِ.
ثُمَّ قَالَ: قَامَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمًا فِينَا خَطِيبًا بِمَاءٍ يُدْعَى خُمًّا بَيْنَ مَكَّةَ وَالْمَدِينَةِ، فَحَمِدَ اللهَ وَأَثْنَى عَلَيْهِ، وَوَعَظَ وَذَكَّرَ، ثُمَّ قَالَ: “أَمَّا بَعْدُ، أَلَا أَيُّهَا النَّاسُ؛ فَإِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ يُوشِكُ أَنْ يَأْتِيَ رَسُولُ رَبِّي فَأُجِيبَ، وَأَنَا تَارِكٌ فِيكُمْ ثَقَلَيْنِ: أَوَّلُهُمَا كِتَابُ اللهِ، فِيهِ الْهُدَى وَالنُّورُ، فَخُذُوا بِكِتَابِ اللهِ، وَاسْتَمْسِكُوا بِهِ”، فَحَثَّ عَلَى كِتَابِ اللهِ وَرَغَّبَ فِيهِ، ثُمَّ قَالَ: “وَأَهْلُ بَيْتِي، أُذَكِّرُكُمُ اللهَ فِي أَهْلِ بَيْتِي، أُذَكِّرُكُمُ اللهَ فِي أَهْلِ بَيْتِي، أُذَكِّرُكُمُ اللهَ فِي أَهْلِ بَيْتِي”.
فَقَالَ لَهُ حُصَيْنٌ: وَمَنْ أَهْلُ بَيْتِهِ يَا زَيْدُ؟ أَلَيْسَ نِسَاؤُهُ مِنْ أَهْلِ بَيْتِهِ؟ قَالَ: نِسَاؤُهُ مِنْ أَهْلِ بَيْتِهِ، وَلَكِنْ أَهْلُ بَيْتِهِ مَنْ حُرِمَ الصَّدَقَةَ بَعْدَهُ، قَالَ: وَمَنْ هُمْ؟ قَالَ: هُمْ آلُ عَلِيٍّ، وَآلُ عَقِيلٍ، وَآلُ جَعْفَرٍ، وَآلُ عَبَّاسٍ، قَالَ: كُلُّ هَؤُلَاءِ حُرِمَ الصَّدَقَةَ؟ قَالَ: نَعَمْ.
“হুসাইন ইবনে সাবরা, উমর ইবনে মুসলিম এবং আমি (ইয়াজিদ ইবনে হাইয়ান) একদা জায়েদ ইবনে আরকাম (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর কাছে গেলাম। আমরা যখন তাঁর পাশে বসলাম‌তখন হুসাইন তাঁকে বললেন,
‘হে জায়েদ! আপনি তো অনেক কল্যাণ লাভ করেছেন। আপনি রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে দেখেছেন, তাঁর কথা শুনেছেন, তাঁর সাথে যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন এবং তাঁর পেছনে সালাত আদায় করেছেন। হে জায়েদ! আপনি সত্যিই অনেক সৌভাগ্যের অধিকারী। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে আপনি যা শুনেছেন, আমাদের কাছে তা বর্ণনা করুন।’ জায়েদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, ‘হে ভ্রাতুষ্পুত্র! আল্লাহর কসম, আমার বয়স হয়েছে, সেই সময়টাও অনেক আগে অতিক্রান্ত হয়েছে এবং রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে যা আমি মুখস্থ রেখেছিলাম, তার কিছু অংশ ভুলেও গেছি। অতএব আমি তোমাদের কাছে যা বর্ণনা করি তা গ্রহণ করো আর যা বর্ণনা না করি সে বিষয়ে আমাকে বাধ্য করো না।’ এরপর তিনি বললেন, ‘একদিন মক্কা ও মদিনার মাঝামাঝি ‘খুম’ নামক স্থানে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদের সামনে ভাষণ দিতে দাঁড়ালেন। তিনি আল্লাহর প্রশংসা ও গুণগান করলেন এবং নসিহত ও উপদেশ দিলেন। তারপর বললেন: “হে লোকসকল! সাবধান! আমি একজন মানুষ মাত্র। অচিরেই আমার রবের পক্ষ থেকে পাঠানো দূত (মৃত্যুর ফেরেশতা) আসবে আর আমিও তাতে সাড়া দেব। আমি তোমাদের মাঝে দুটি ভারী বস্তু (মূল্যবান সম্পদ) রেখে যাচ্ছি। প্রথমটি হলো, আল্লাহর কিতাব, যাতে রয়েছে হেদায়েত ও নূর। তোমরা আল্লাহর কিতাবকে আঁকড়ে ধরো এবং তা দৃঢ়ভাবে ধারণ করো।’ তিনি আল্লাহর কিতাবের প্রতি অত্যন্ত উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা দিলেন। এরপর বললেন, ‘আর (দ্বিতীয়টি হলো) আমার আহলে বাইত (পরিবারবর্গ)। আমি আমার আহলে বাইতের ব্যাপারে তোমাদের আল্লাহকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি (অর্থাৎ তাদের অধিকার ও সম্মান রক্ষায় আল্লাহর ভয় দেখাব)।’ কথাটি তিনি তিনবার বললেন। হুসাইন জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে জায়েদ! তাঁর আহলে বাইত কারা? তাঁর স্ত্রীগণ কি আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত নন?’ জায়েদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, ‘তাঁর স্ত্রীগণও আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত। তবে (মূলত) আহলে বাইত তারা, যাদের ওপর নবীজির ওফাতের পর সদকা গ্রহণ করা হারাম।” হুসাইন জিজ্ঞেস করলেন, ‘তারা কারা?’ তিনি বললেন, ‘তারা হলো আলি-্এর পরিবার, আকিলের পরিবার, জাফরের পরিবার এবং আব্বাসের পরিবার।’ হুসাইন আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘এদের সবার জন্যই কি সদকা হারাম?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ’।” [সহিহ মুসলিম: ২৪০৮] আরও বর্ণিত হয়েছে, মুসনাদে ইমাম আহমদ (১৯২৬৫), আবু আওয়ানা (১০৬৭৭) এবং তাবারানি (৫/১৮৩, হাদিস নং ৫০২৮)
❑ শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের নিকট আহলে বাইত বা নবী পরিবারের মর্যাদা প্রসঙ্গে বলেন:
وَيُحِبُّونَ أَهْلَ بَيْتِ رَسُولِ اللهِ صَلَّىْ اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمْ، وَيَتَوَلَّوْنَهُمْ، وَيَحْفَظُونَ فِيهِمْ وَصِيَّةَ رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم: حَيْثُ قَالَ يَوْمَ غَدِيرِ خُمٍّ: “أُذَكِّرُكُمُ اللهَ فِي أَهْلِ بَيْتِي” وَقَالَ أَيْضًا لِلْعَبَّاسِ عَمِّه وَقَدِ اشْتَكَى إِلَيْهِ أَنَّ بَعْضَ قُرَيْشٍ يَجْفُو بَنِي هَاشِمٍ- فَقَالَ: “وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ؛ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحِبُّوكُمْ؛ للهِ وَلِقَرَابَتِي وَقَالَ: “إِنَّ اللهَ اصْطَفَى بَنِي إِسْمَاعِيلَ، وَاصْطَفَى مِنْ بَنِي إِسْمَاعِيلَ كِنَانَةَ وَاصْطَفَى مِنْ كِنَانَةَ قُرَيْشًا، وَاصْطَفَى مِنْ قُرَيْشٍ بَنِي هَاشِمٍ، وَاصْطَفَانِي مِنْ بَنِي هَاشِمٍ”
“আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের লোকগণ নবী পরিবারের সকল সদস্যকে ভালবাসে, তাদের সাথে বন্ধুত্ব রাখে এবং তাদের ব্যাপারে রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ঐ অসিয়তকে হেফাজত করে, যা তিনি গাদিরে খুমের দিন করেছিলেন। তিনি সেদিন বলেছেন, ‘আমি তোমাদেরকে আমার আহলে বাইতের ব্যাপারে আল্লাহর আদেশ স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি’।” [মাজমু ফাতাওয়া ৩/১৫৪]
তাঁর চাচা আব্বাস (রা.) যখন তাঁর নিকট অভিযোগ করলেন, কুরাইশদের কিছু লোক বনি হাশেমদের লোকদের সাথে দুর্ব্যবহার করছে, তখন তিনি বললেন, “সেই সত্তার শপথ! যার হাতে আমার প্রাণ! তারা ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ না তারা আল্লাহর জন্য এবং আমার সাথে আত্মীয়তার কারণে তোমাদেরকে ভালবাসবে।” রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা আদম সন্তানদের থেকে বনী ইসমাইলকে বাছাই করে নিয়েছেন। ইসমাইলের সন্তানদের থেকে বনী কেনানাকে নির্বাচন করেছেন। আর বনী কেনানা থেকে কুরাইশকে বাছাই করে নিয়েছেন। কুরাইশ বংশ থেকে নির্বাচিত করেছেন বনী হাশেমকে। আর হাশেমের বংশ থেকে নির্বাচন করেছেন আমাকে।” [সহীহ মুসলিম, ৪২২১]
❑ আহলে বাইত বা নবী পরিবারকে নিঃশর্ত অনুসরণে ব্যাপারে কোনও সহিহ হাদিস নেই:
বিভিন্ন হাদিস গ্রন্থে এমন কিছু হাদিস পাওয়া যায় যেগুলোতে বলা হয়েছে যে, তোমরা আল্লাহর কিতাব এবং আহলে বাইতকে অনুসরণ করো তাহলে পথভ্রষ্ট হবে না। কিন্তু এ মর্মে বর্ণিত হাদিসগুলো সবগুলোই দুর্বল।
──────────
❑ নিম্নে এমন কয়েকটি জইফ (দুর্বল) হাদিস উপাস্থাপন করা হলো:
✪ ১ম:
“إِنِّي تَارِكٌ فِيكُمْ مَا إِنْ تَمَسَّكْتُمْ بِهِ لَنْ تَضِلُّوا بعدي أَحَدُهُمَا أَعْظَمُ مِنَ الآخَرِ كِتَابُ اللهِ حَبْلٌ مَمْدُودٌ مِنَ السَّمَاءِ إِلَى الأَرْضِ، وَعِتْرَتِي أَهْلُ بَيْتِي، وَلَنْ يَتَفَرَّقَا حَتَّى يَرِدَا عَلَيَّ الحَوْضَ فَانْظُرُوا كَيْفَ تَخْلُفُونِي فِيهِمَا”
“আমি তোমাদের মাঝে এমন কিছু রেখে যাচ্ছি যা আঁকড়ে ধরলে তোমরা কখনোই পথভ্রষ্ট হবে না। এর একটি অন্যটির চেয়ে বড় আল্লাহর কিতাব যা আকাশ থেকে জমিন পর্যন্ত বিস্তৃত এক রশি এবং আমার পরিবার (আহলে বাইত)। তারা হাউজে কাউসারে আমার কাছে না আসা পর্যন্ত একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হবে না। সুতরাং দেখো, আমার অবর্তমানে তোমরা তাদের সাথে কেমন আচরণ করো।” [সুনানে তিরমিজি ৩৭৮৮]
➧ মুহাদ্দিসগণের মতামত:
এর ইসনাদ জইফ বা দুর্বল। এই সূত্রে হাবিব বিন আবি সাবিত রয়েছেন, যিনি একজন ‘মুদাল্লিস’ (বর্ণনাকারীর নাম গোপনকারী)। ইমাম আলী ইবনুল মাদিনী বলেছেন, ইবনে আব্বাস ও আয়েশা (রা.) ছাড়া অন্য কোনো সাহাবীর থেকে তাঁর সরাসরি হাদিস শোনা প্রমাণিত নয়। এছাড়া বর্ণনাকারী আ’মাশও একজন মুদাল্লিস। [জামেউত তাহসিল, ১১৭]
✪ ২য়:
“أَيُّهَا النَّاسُ، إِنِّي تَارِكٌ فِيكُمْ أَمْرَيْنِ لَنْ تَضِلُّوا إِنِ اتَّبَعْتُمُوهُمَا، وَهُمَا كِتَابُ اللَّهِ، وَأَهْلُ بَيْتِي عِتْرَتِي”
“হে লোকসকল! আমি তোমাদের মাঝে দুটি বিষয় রেখে যাচ্ছি। যদি তোমরা তা অনুসরণ করো তবে কখনোই পথভ্রষ্ট হবে না। আর তা হলো আল্লাহর কিতাব এবং আমার পরিবার (আহলে বাইত)।” [মুস্তাডরাকে হাকেম ৪৫৭৭]
➧ মুহাদ্দিসগণের মতামত:
এর ইসনাদ ওয়াহি (অত্যন্ত দুর্বল)। এর সূত্রে মুহাম্মদ বিন সালামাহ বিন কুহাইল রয়েছেন। ইমাম জুযজানি তাঁকে ‘যাহিবুল হাদিস’ (পরিত্যক্ত) বলেছেন। ইবনে আদি তাঁকে কুফার কট্টর শিয়াদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন।[আহওয়ালুর রিজাল, পৃষ্ঠা ৮৬; আল কামিল, ৭/৪৪৫]
✪ ৩য়:
“إِنِّي تَارِكٌ فِيكُمُ الثَّقَلَيْنِ كِتَابَ اللهِ، وَأَهْلَ بَيْتِي، وَإِنَّهُمَا لَنْ يَتَفَرَّقَا حَتَّى يَرِدَا عَلَيَّ الْحَوْضَ”
“আমি তোমাদের মাঝে দুটি ভারী বস্তু রেখে যাচ্ছি আল্লাহর কিতাব এবং আমার আহলে বাইত। তারা হাউজে কাউসারে আমার সাথে মিলিত হওয়া পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন হবে না।” [তাবারানি ৫/১৬৯]
➧ মুহাদ্দিসগণের মতামত:
এই সূত্রটি মুনকার (অগ্রহণযোগ্য)। এর সূত্রে হাসান বিন উবাইদুল্লাহ রয়েছেন। ইমাম বুখারি বলেছেন, তাঁর বর্ণনাগুলো ‘মুদতারিব’ (বিশৃঙ্খল), তাই তিনি তাঁর হাদিস গ্রহণ করেননি। [তাহজিবুত তাহজিব, ২/২৯২]
✪ ৪র্থ:
“إِنِّي تَارِكٌ فِيكُمُ الثَّقَلَيْنِ، أَحَدُهُمَا أَكْبَرُ مِنَ الْآخَرِ كِتَابُ اللهِ حَبْلٌ مَمْدُودٌ مِنَ السَّمَاءِ إِلَى الْأَرْضِ، وَعِتْرَتِي أَهْلُ بَيْتِي، وَإِنَّهُمَا لَنْ يَفْتَرِقَا حَتَّى يَرِدَا عَلَيَّ الْحَوْضَ”
“আমি তোমাদের মাঝে দুটি ভারী বস্তু রেখে যাচ্ছি, যার একটি অন্যটির চেয়ে বড়। আল্লাহর কিতাব—যা আকাশ থেকে জমিন পর্যন্ত বিস্তৃত রশি এবং আমার পরিবার (আহলে বাইত)। তারা হাউজে কাউসারে আসা পর্যন্ত একে অপর থেকে পৃথক হবে না।” [মুসনাদে আহমদ ১১১০৪]
➧ মুহাদ্দিসগণের মতামত:
এর ইসনাদ জইফ বা দুর্বল। এর বর্ণনাকারী আতিয়্যাহ আল আউফি সর্বসম্মতিক্রমে দুর্বল বলে বিবেচিত।
ইমাম আহমদ বিন হাম্বল এই হাদিসটিকে কুফাবাসীদের বর্ণনাকৃত ‘মুনকার’ হাদিসগুলোর অন্তর্ভুক্ত করেছেন। [দিওয়ানুয যুয়াফা, ২৮৪৩; আল মুন্তাখাব মিনাল ইলাল, ১১৭]
✪ ৫ম:
“يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي تَرَكْتُ فِيكُمْ مَا إِنْ أَخَذْتُمْ بِهِ لَنْ تَضِلُّوا كِتَابَ اللهِ، وَعِتْرَتِي أَهْلُ بَيْتِي”
“হে লোকসকল! আমি তোমাদের মাঝে এমন কিছু রেখে গেলাম যা আঁকড়ে ধরলে তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না আল্লাহর কিতাব এবং আমার আহলে বাইত।” [সুনানে তিরমিজি ৩৭৮৬]
➧ মুহাদ্দিসগণের মতামত:
এর ইসনাদ অত্যন্ত দুর্বল (ضعيف جدا)। এর সূত্রে যায়েদ বিন হাসান আলআনমাতি রয়েছেন। ইমাম আবু হাতিম তাঁকে ‘মুনকারুল হাদিস’ বলেছেন। [আলজারহু ওয়াত তা’দীল, ৩/৫৬০]
✪ ৬ষ্ঠ:
“إِنِّي تَارِكٌ فِيكُمْ خَلِيفَتَيْنِ كِتَابُ اللهِ، حَبْلٌ مَمْدُودٌ مَا بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ، أَوْ مَا بَيْنَ السَّمَاءِ إِلَى الْأَرْضِ، وَعِتْرَتِي أَهْلُ بَيْتِي، وَإِنَّهُمَا لَنْ يَتَفَرَّقَا حَتَّى يَرِدَا عَلَيَّ الْحَوْضَ”
“আমি তোমাদের মাঝে দুজন প্রতিনিধি রেখে যাচ্ছি আল্লাহর কিতাব—যা আকাশ ও জমিনের মাঝে বিস্তৃত রশি এবং আমার পরিবার (আহলে বাইত)। তারা হাউজে কাউসারে আসা পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন হবে না।” [মুসনাদে আহমদ ২১৫৭৮]
➧ মুহাদ্দিসগণের মতামত::
এটি সহিহ নয়। এর বর্ণনাকারী কাসিম বিন হাসান সম্পর্কে ইমাম বুখারি বলেছেন, তাঁর হাদিস ‘মুনকার’ এবং তিনি অপরিচিত। [মিজানুল ইতিদাল, ৩/৩৬৯]
✪ ৭ম:
“إِنِّي تَرَكْتُ فِيكُمْ مَا إِنْ أَخَذْتُمْ بِهِ لَنْ تَضِلُّوا كِتَابَ اللَّهِ سَبَبُهُ بِيَدِ اللَّهِ، وَسَبَبُهُ بِأَيْدِيكُمْ، وَأَهْلَ بَيْتِي”
“আমি তোমাদের মাঝে এমন কিছু রেখে গেলাম যা গ্রহণ করলে তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না আল্লাহর কিতাব—যার এক প্রান্ত আল্লাহর হাতে এবং অন্য প্রান্ত তোমাদের হাতে এবং আমার আহলে বাইত।” [সুনানে ইবনে আবি আসিম ১৫৫৮]
➧ মুহাদ্দিসগণের মতামত:
এর ইসনাদ ‘لا يصح (সহিহ নয়)। এর প্রথম সূত্রে মুহাম্মদ বিন উমর ‘মাজহুল’ (অপরিচিত) এবং কাসির বিন যায়েদ ‘দুর্বল’। দ্বিতীয় সূত্রে হারিস আলআওয়ার রয়েছেন, যাকে ইমাম শাবি ও অন্যরা ‘মিথ্যাবাদী’ (কাযযাব) হিসেবে অভিযুক্ত করেছেন। [আলজারহু ওয়াত তা’দীল, ৩/৭৯]
◯ এর বিপরীতে বিভিন্ন হাদিসে কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণের নির্দেশনা এসেছে। সেগুলোর মধ্যে একটি হাদিস হল,
রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
“يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي قَدْ تَرَكْتُ فِيكُمْ مَا إِنِ اعْتَصَمْتُمْ بِهِ فَلَنْ تَضِلُّوا أَبَدًا كِتَابَ اللَّهِ وَسُنَّةَ نَبِيِّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ”
“হে লোকসকল! আমি তোমাদের মাঝে এমন কিছু রেখে গিয়েছি যা দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরলে তোমরা কখনোই পথভ্রষ্ট হবে না; তা হলো আল্লাহর কিতাব এবং তাঁর নবীর সুন্নাহ।” [মুস্তাদরাকে হাকেম: ৩১৮]
এই বর্ণনার ইসনাদ সহিহ। এই হাদিসটি ইসমাইল বিন আবি উওয়াইস তাঁর পিতার সূত্রে এবং মুহাম্মদ বিন ইসহাক যুহরীর সূত্রে বর্ণনা করেছেন। যদিও মুয়াত্তায় এটি সরাসরি (بلاغاً) এসেছে তবে ইবনে আব্বাস (রা.)-এর এই সূত্রটি শক্তিশালী। এছাড়া বিদায় হজের অন্যান্য ভাষণের সাথে এর অর্থের মিল রয়েছে। ইমাম ইবনে আব্দুল বার (রহ.) বলেছেন, এই হাদিসটি আলেমদের নিকট অত্যন্ত পরিচিত ও প্রসিদ্ধ, যা এর বর্ণনাসূত্রের প্রয়োজনীয়তাকেও ছাপিয়ে যায় [আত তামহিদ: ২৪/৩৩১]। মুহাদ্দিস শাইখ আলবানি (রহ.) এই হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন [সহিহুল জামে: ২৯৩৭]।
❑ আহলে বাইত বা নবী পরিবারের অনুসরণ: মূলনীতি ও শর্তাবলী:
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পরবর্তীতে যুগ পরম্পরায় নবী পরিবারের সকল সদস্য নিঃশর্তভাবে অনুসরণীয় নন। তাঁদের অনুসরণের বিষয়টি নির্দিষ্ট কিছু শর্ত ও মানদণ্ডের ওপর নির্ভরশীল:
◈ ১. আহলে বাইতের সদস্যগণের মধ্যে শুধুমাত্র তাঁরাই অনুসরণীয়, যাঁরা নিজেদের জীবন আল্লাহর কিতাব ও রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাহর ছাঁচে গড়েছেন। কারণ দ্বীনের মানদণ্ড হলো ওহি। কোনো বিশেষ বংশীয় পরিচয় নয়।
◈ ২. ইসলামি আকিদা অনুযায়ী একমাত্র নবী-রসুলগণই ‘মাসুম’ বা নিষ্পাপ। আহলে বাইতের সদস্যগণ সম্মানীত হওয়া সত্ত্বেও মানুষ হিসেবে ভুল-ভ্রান্তির ঊর্ধ্বে নন। তাই তাঁদের কোনো কথা বা কাজ যদি কুরআন-সুন্নাহর অকাট্য দলিলের সাথে সাংঘর্ষিক হয় তবে বংশীয় সম্পর্কের দোহাই দিয়ে তা গ্রহণ করা যাবে না।
◈ ৩. তাঁদের মধ্যে যাঁরা হক্কানী আলেম, মুত্তাকি এবং দ্বীনদার উম্মত কেবল তাঁদেরই অনুসরণ করবে। ইমাম ইবনে তাইমিয়া ও অন্যান্য মুহাদ্দিসগণের মতে, ‘আহলে বাইত’ এবং ‘আল্লাহর কিতাব’ কখনো বিচ্ছিন্ন হবে না—এই কথার অর্থ হলো, কিয়ামত পর্যন্ত নবী পরিবারের একটি দল সর্বদা হকের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে। উম্মতের দায়িত্ব হলো সেই হকপন্থীদের খুঁজে বের করা এবং তাঁদের আদর্শ গ্রহণ করা।
◈ ৪. আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসা রাখা প্রত্যেক মুমিনের ঈমানি দায়িত্ব (নিঃশর্ত ভালোবাসা)। তবে আমল ও ফতোয়ার ক্ষেত্রে অনুসরণ কেবল তাঁদেরই করা হবে, যাঁরা ইলমে দ্বীন ও সুন্নাহর ওপর সুদৃঢ় (শর্তযুক্ত অনুসরণ)।
মোটকথা, আহলে বাইতের মধ্যে যাঁরা আল্লাহওয়ালা, পরহেজগার এবং সুন্নাহর একনিষ্ঠ অনুসারী তাঁরাই আমাদের জন্য পথপ্রদর্শক। তাঁদের বংশীয় আভিজাত্য যখন ইলম ও তাকওয়ার সাথে মিলিত হয় তখন তা আমাদের জন্য ‘নূরুন আলা নূর’ বা আলোর ওপর আলো হিসেবে কাজ করে। আহলে বাইতের যথাযথ মর্যাদা রক্ষা করা এবং তাঁদের সুন্নাহপন্থী সদস্যদের অনুসরণ করাই হলো প্রকৃত ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।
❑ উপসংহার ও সারাংশ:
পরিশেষে বলব, পরকালীন মুক্তি এবং সফলতার জন্য মুসলিম উম্মাহর ওপর প্রধান ও অপরিহার্য কর্তব্য হলো—একমাত্র আল্লাহর কিতাব এবং রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর বিশুদ্ধ সূত্রে প্রমাণিত সুন্নাহর যথাযথ অনুসরণ করা। দ্বীনের এই দুটি মজবুত স্তম্ভই হচ্ছে হেদায়েতের মূল উৎস। এর পাশাপাশি, আহলে বাইত বা নবী পরিবারের প্রতি অন্তরের গভীর থেকে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং তাঁদের বিশেষ মর্যাদা বজায় রাখা আমাদের ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে অনুসরণের ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো—নবী পরিবারের সদস্যদের মধ্যে যাঁরা আল্লাহর কিতাব ও সুন্নাহর অনুসারী, দ্বীনদার এবং পরহেজগার কেবল তাঁদেরকেই আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
সেই সাথে আমাদের অত্যন্ত সচেতন থাকতে হবে সেই সব স্বার্থান্বেষী মহলের ব্যাপারে, যারা আহলে বাইতের প্রতি অতি-ভক্তি বা ভালোবাসার আড়ালে বাড়াবাড়িতে লিপ্ত। বিশেষ করে যারা জাল ও অত্যন্ত দুর্বল হাদিসের আশ্রয় নিয়ে সাধারণ মুসলিমদের বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চালায় এবং উম্মাহর ঐক্য নষ্ট করে, তাদের আসল পরিচয় ও মতবাদ সম্পর্কে জাতিকে সতর্ক করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সব ধরণের ফিতনা, বিভ্রান্তি ও গোমরাহি থেকে হেফাজত করুন এবং সিরাতুল মুস্তাকিমের ওপর অবিচল রাখুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
লেখক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

বজ্রপাতের সময় পঠিতব্য সুন্নাহ সম্মত দোয়া

 বজ্রপাত হচ্ছে আসমানি দুর্যোগ। মানুষকে অন্যায় থেকে বিরত রাখার একটি সতর্কবার্তাও বটে। এ বজ্রপাত আল্লাহ তাআলা শক্তিমত্তার এক মহা নিদর্শন। তিনি ইচ্ছা করলেই যে কাউকে এ বজ্রপাতের মাধ্যমে শাস্তি দিতে পারেন। আবার মানুষও এ বজ্রপাত থেকে সর্বোত্তম শিক্ষা নিতে পারে। আল্লাহ তাআলা কুরআনের একটি সুরা নাম রেখেছেন রাদ। যার অর্থও বজ্রপাত। বজ্রপাত নামে নাজিল হওয়া সুরায় মহান আল্লাহ সে কথাই ঘোষণা করেছেন-

هُوَ الَّذِي يُرِيكُمُ الْبَرْقَ خَوْفًا وَطَمَعًا وَيُنْشِئُ السَّحَابَ الثِّقَالَ – وَيُسَبِّحُ الرَّعْدُ بِحَمْدِهِ وَالْمَلاَئِكَةُ مِنْ خِيفَتِهِ وَيُرْسِلُ الصَّوَاعِقَ فَيُصِيبُ بِهَا مَن يَشَاء وَهُمْ يُجَادِلُونَ فِي اللّهِ وَهُوَ شَدِيدُ الْمِحَالِ
“তিনিই তোমাদের বিদ্যুৎ দেখান ভয়ের জন্য এবং আশার জন্য এবং উপেক্ষিত করেন ঘন মেঘমালা। তাঁর (তাহমিদ) প্রশংসা কর। বজ্র এবং ফেরেশতারাও তার ভয়ে (তাসবিহ রত)। তিনি বজ্রপাত করেন। অতঃপর যাকে ইচ্ছা তিনি তা (বজ্রপাত) দ্বারা আঘাত করেন। এরপরও তারা আল্লাহ সম্পর্কে বিতর্ক করে অথচ তিনি মহাশক্তিশালী।” [সুরা রাদ: ১২-১৩]
নিম্নে বজ্রপাত এবং বিদ্যুৎ চমকানো প্রসঙ্গে কী দোয়া পড়তে হয় সে বিষয়ে আলেমদের দুটি ফতোয়া উল্লেখ করার মাধ্যমে আলোচনা করা হলো:
✅ ১. সৌদি আরবের সাবেক প্রধান মুফতি আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন বায (রাহ.)
প্রশ্ন: বজ্রপাতের শব্দ শোনা বা বিদ্যুৎ চমক দেখার সময় শরিয়তসম্মত কোনো দোয়া আছে কি না? জাযাকাল্লাহু খাইরান।
উত্তর: কিছু হাদিসে এসেছে যে, বজ্রপাতের শব্দ শোনার সময় বলা হয়:
سُبْحَانَ الَّذِي يُسَبِّحُ الرَّعْدُ بِحَمْدِهِ وَالْمَلَائِكَةُ مِنْ خِيفَتِهِ
উচ্চারণ: “সুবহানাল্লাযী ইউসাব্বিহুর রা’দু বিহামদিহী ওয়াল মালা-য়িকাতু মিন খীফাতিহ।”
অর্থ: “আমি তার পবিত্রতা বর্ণনা করি যার ভয়ে বজ্রধ্বনি ও ফেরেশতাবর্গ তাঁর সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে।” [সূরা রাদ: ১৩]
আব্দুল্লাহ ইবনুয যুবাইর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বজ্রপাত শুনলে এ দুআটি পড়তেন। কিন্তু বিদ্যুৎ চমক (আলো) দেখার সময় বিশেষ কোনো দোয়া পড়ার ব্যাপারে আমার জানা নেই। আমি সুন্নাহ থেকে এ বিষয়ে কিছু পাইনি।”
[source: binbaz org]
✅ ২. প্রশ্ন: বজ্রপাতের শব্দ শোনার সময় কোন দোয়া পড়তে হয়?
উত্তর: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), তাঁর পরিবারবর্গ ও সাহাবিদের ওপর। অতপর━
আব্দুল্লাহ ইবনুয যুবাইর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে সহিহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বজ্রপাতের শব্দ শুনলে কথাবার্তা বন্ধ করে দিতেন এবং বলতেন:
سُبْحَانَ الَّذِي يُسَبِّحُ الرَّعْدُ بِحَمْدِهِ وَالْمَلَائِكَةُ مِنْ خِيفَتِهِ
উচ্চারণ: “সুবহানাল্লাযী ইউসাব্বিহুর রা’দু বিহামদিহী ওয়াল মালা-য়িকাতু মিন খীফাতিহ।”
অর্থ: “আমি তার পবিত্রতা বর্ণনা করি যার ভয়ে বজ্রধ্বনি ও ফেরেশতাবর্গ তাঁর সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে।” [সূরা রাদ: ১৩]
এরপর তিনি বলতেন: “নিশ্চয়ই এটি পৃথিবীর জন্য কঠিন শাস্তির সতর্কবার্তা।” [ইমাম বুাখারির আল আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ৭২৩, সহিহ সনদে বর্ণিত]
তাই কেউ যদি এই সাহাবির অনুসরণে এটি পড়ে তাহলে এতে কোনো সমস্যা নেই। তবে আমরা এমন কোনো সহিহ হাদিস পাইনি, যেখানে এটি সরাসরি রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে প্রমাণিত।
আল্লাহু আলাম-আল্লাহই সর্বজ্ঞ।” [সূত্র: ইসলাম ওয়েব]
🛑 বজ্রপাত থেকে রক্ষার নিম্নোক্ত দোয়াটা জইফ (দুর্বল):
اللَّهُمَّ لاَ تَقْتُلْنَا بِغَضَبِكَ وَلاَ تُهْلِكْنَا بِعَذَابِكَ وَعَافِنَا قَبْلَ ذَلِكَ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা লা-তাক্বতুলনা বিগাযাবিকা, ওয়া লা-তুহলিকনা বিআযা-বিকা; ওয়া আ-ফিনা-ক্বাবলা যা-লিকা।’
অর্থ: হে আল্লাহ, আপনি আমাকে আপনার গজব দিয়ে হত্যা করে দেবেন না এবং আপনার আজাব দিয়ে ধ্বংস করে দেবেন না। এসবের আগেই আপনি আমাকে পরিত্রাণ দিন।’ [তিরমিজি, হা/৩৪৫০]
এ হাদিসে বলা হয়েছে, কেউ যদি বজ্রপাতের সময় এ দুআ পড়ে তাহলে সে রক্ষা পাবে। কিন্তু হাদিসটি সহিহ নয়। [দেখুন: যায়ীফাহ-শাইখ আলবানি , হা/১০৪২। আজকার-নওয়াবি, হা/২৩৪। তাখরিজুল মুসনাদ-শুয়াইব আরনাবুত, হা/ ৫৭৬৩]
❑ বজ্রপাতের সময় উপরোক্ত দুআটি (সুবহানাল্লাযী ইউসাব্বিহুর রা’দু বিহামদিহি….) পড়ার ফজিলত:
ইমাম নওয়াবি (রাহ.) বলেন: “ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেছেন:
كنّا مع عمر رضي الله عنه في سفر، فأصابنا رعدٌ وبرقٌ وبَرَدٌ، فقال لنا كعب: مَن قال حين يسمع الرعد: سُبْحَانَ مَنْ يُسَبِّحُ الرَّعْدُ بِحَمْدِهِ وَالمَلائِكَةُ مِنْ خِيفَتِهِ، ثلاثاً، عُوفي مِنْ ذلكَ الرعد، فقلنا فعوفينا
“আমরা একবার ওমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর সাথে সফরে ছিলাম। তখন আমরা বজ্রপাত, বিদ্যুৎ চমক ও শিলাবৃষ্টির কবলে পড়লাম। এ সময় কাব (রহ.) আমাদের বললেন: ‘যে ব্যক্তি বজ্রপাতের শব্দ শোনার সময় তিনবার পাঠ করবে:
سُبْحَانَ مَنْ يُسَبِّحُ الرَّعْدُ بِحَمْدِهِ وَالمَلائِكَةُ مِنْ خِيفَتِهِ
(সুবহা-নাল্লাযী ইউসাব্বিহুর রা’দু বিহামদিহী ওয়াল মালা-য়িকাতু মিন খীফাতিহ) সে ওই বজ্রপাতের অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকবে।”
আমরা তা পাঠ করলাম এবং নিরাপদ থাকলাম।” [আল আযকার লিন-নববী, পৃষ্ঠা: ১৮১]
ইবনে আল্লান (রহ.) বলেন: “হাফেজ (ইবনে হাজার) বলেছেন: “এই বর্ণনাটি ‘মাওকুফ’ (সাহাবির আমল)। তবে এর সনদ বা সূত্র বেশ উন্নত। এটি কাব রা.-এর উক্তি হলেও ইবনে আব্বাস ও ওমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) এর সমর্থন দিয়েছেন। এতে বোঝা যায়, এই আমলটির একটি সুদৃঢ় ভিত্তি রয়েছে।” [আল ফুতুহাতুর রব্বানিয়্যাহ আলাল আযকারিন নাওয়াবিয়্যাহ: ৪/২৮৬]
আল্লাহ তাআলা আমাদেরক সকল ধরণের আসমানি ও জমিনি বালা-মুসিবত ও আজাব-গজব থেকে হেফাজত করুন। আমিন। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
লেখক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের নিকট আহলে বায়েত তথা নবী পরিবারের মর্যাদা

 مكانة أهل البيت عند أهل السنة والجماعة

লেখক: ড. আল্লামা শায়েখ সালেহ ফাওজান
অনুবাদ: শাইখ আবদুল্লাহ শাহেদ আল মাদানি
────────
শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন:
وَيُحِبُّونَ أَهْلَ بَيْتِ رَسُولِ اللهِ صَلَّىْ اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمْ، وَيَتَوَلَّوْنَهُمْ، وَيَحْفَظُونَ فِيهِمْ وَصِيَّةَ رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم: حَيْثُ قَالَ يَوْمَ غَدِيرِ خُمٍّ: «أُذَكِّرُكُمُ اللهَ فِي أَهْلِ بَيْتِي» وَقَالَ أَيْضًا لِلْعَبَّاسِ عَمِّه وَقَدِ اشْتَكَى إِلَيْهِ أَنَّ بَعْضَ قُرَيْشٍ يَجْفُو بَنِي هَاشِمٍ — فَقَالَ: «وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ؛ لاَ يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحِبُّوكُمْ؛ لِللهِ وَلِقَرَابَتِي» وَقَالَ: «إِنَّ اللهَ اصْطَفَى بَنِي إِسْمَاعِيلَ، وَاصْطَفَى مِنْ بَنِي إِسْمَاعِيلَ كِنَانَةَ، وَاصْطَفَى مِنْ كِنَانَةَ قُرَيْشًا، وَاصْطَفَى مِنْ قُرَيْشٍ بَنِي هَاشِمٍ، وَاصْطَفَانِي مِنْ بَنِي هَاشِمٍ»
বাংলা অনুবাদ:
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের লোকেরা নবী পরিবারের সকল সদস্যকে ভালোবাসে, তাদের সাথে বন্ধুত্ব রাখে এবং তাদের ব্যাপারে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঐ অসিয়তকে হেফাজত করে, যা তিনি গাদিরে খুম্মের দিন করেছিলেন। তিনি সেদিন বলেছেন:
«أُذَكِّرُكُمُ اللهَ فِي أَهْلِ بَيْتِي»
”আমি তোমাদেরকে আমার আহলে বাইতের ব্যাপারে আল্লাহর আদেশ স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি।”[১]
তাঁর চাচা আব্বাস যখন তাঁর নিকট অভিযোগ করলেন যে কুরাইশদের কিছু লোক বনি হাশিমদের সাথে দুর্ব্যবহার করছে, তখন তিনি বললেন: ”সেই সত্তার শপথ! যাঁর হাতে আমার প্রাণ! তারা ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না তারা আল্লাহর জন্য এবং আমার সাথে আত্মীয়তার কারণে তোমাদেরকে ভালোবাসবে।” রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরও বলেন: ”নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা আদম সন্তানদের থেকে বনি ইসমাঈলকে বাছাই করে নিয়েছেন। ইসমাঈলের সন্তানদের থেকে বনি কিনানাকে নির্বাচন করেছেন। আর বনি কিনানা থেকে কুরাইশকে বাছাই করে নিয়েছেন। কুরাইশ বংশ থেকে নির্বাচিত করেছেন বনি হাশিমকে। আর হাশিমের বংশ থেকে নির্বাচন করেছেন আমাকে।”[২]
────────
ব্যাখ্যা:
শায়খুল ইসলাম এখানে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের নিকট আহলে বাইত তথা নবী পরিবারের মর্যাদা বর্ণনা করেছেন। তারা রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আহলে বাইতকে ভালোবাসে। নবী পরিবারের ঐ সকল সদস্য আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত, যাদের জন্য সাদকাহ গ্রহণ করা হারাম করা হয়েছে। তারা হলেন: আলি (রা.), জাফর, আকিল, আব্বাস (রা.) এবং তাঁদের পরিবারের সকল সদস্য।
এমনিভাবে হারিস বিন আবদুল মুত্তালিবের সন্তানগণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীগণ এবং কন্যাগণও আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন:
﴿إِنَّمَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيُذْهِبَ عَنكُمُ الرِّجْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَكُمْ تَطْهِيرًا﴾
”আল্লাহ ইচ্ছা করেন তোমাদের নবী পরিবার থেকে ময়লা দূর করতে এবং তোমাদের পুরোপুরি পাক-পবিত্র করে দিতে।” [সূরা আহযাব: ৩৩]
সুতরাং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের লোকেরা নবী পরিবারের সদস্যদেরকে ভালোবাসে এবং সম্মান করে। কেননা তাদেরকে ভালোবাসা ও সম্মান করা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে ভালোবাসা ও সম্মান করারই অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তাআলা এবং রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদেরকে সম্মান করার আদেশ দিয়েছেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
﴿قُل لَّا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا إِلَّا الْمَوَدَّةَ فِي الْقُرْبَى﴾
”হে নবী! এসব লোককে বলে দাও, এ কাজের জন্য আমি তোমাদের কাছে কোনো পারিশ্রমিক চাই না; তবে আত্মীয়তার ভালোবাসা অবশ্যই চাই।” [সূরা শুরা: ২৩]
সুন্নাতে এই বিষয়ে অনেক দলিল রয়েছে। এগুলো থেকে শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া কিছু উল্লেখ করেছেন। তবে ভালোবাসা পাওয়ার শর্ত হলো, রাসুল (সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আত্মীয়দের সালাফদের ন্যায় সুন্নাতের অনুসারী হতে হবে এবং দ্বীনের উপর সুদৃঢ় থাকতে হবে—যেমন ছিলেন আব্বাস ও তাঁর সন্তানগণ এবং আলি ও তাঁর সন্তানগণ। পক্ষান্তরে যারা রাসুলের সুন্নাতের বিরোধিতা করবে এবং দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে না, তাদেরকে ভালোবাসা নাজায়েজ — যদিও তারা আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত হয়।
يَتَوَلَّوْنَهُمْ
”তাদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে” অর্থাৎ তাদেরকে ভালোবাসে। يَتَوَلَّوْنَ শব্দটি الوَلاَء থেকে গৃহীত হয়েছে। الوَلاَء-এর অর্থ হলো ভালোবাসা।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের লোকেরা রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অসিয়ত অনুযায়ী আমল করে এবং তা বাস্তবায়ন করে। তিনি গাদিরে খুম্মের দিন বলেছেন: ”আমি তোমাদেরকে আমার আহলে বাইতের ব্যাপারে আল্লাহর আদেশ স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি।’ বন্যার বা বৃষ্টির পানি যেখানে গিয়ে জমা হয়, তাকে غَدِيْر (গাদির) বলা হয়। বলা হয়ে থাকে যে খুম্ম একজন ব্যক্তির নাম; তার দিকে সম্বোধন করে সেই স্থানটিকে غَدِيرُ خُمٍّ বা ‘খুম্মের জলাশয়’ বলা হয়। কেউ কেউ বলেছেন, বৃক্ষাবৃত একটি স্থানের নাম হলো খুম্ম। জলাশয়টি সেখানেই অবস্থিত ছিল বলে এই নামে পরিচিত হয়েছে। এই পুকুর বা জলাশয়টি মক্কা থেকে মদিনায় আসার পথে (জুহফায়) অবস্থিত ছিল। বিদায় হজ থেকে ফিরে আসার সময় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই জলাশয়ের পাশ দিয়ে অতিক্রম করেছিলেন এবং সেখানে ভাষণ দিয়েছিলেন। সেই ভাষণে উপরোক্ত কথাটিও ছিল, যা শায়খুল ইসলাম উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ তিনি বলেছিলেন: ”আল্লাহ তাআলা আমার আহলে বাইতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং তাদের হক আদায় করার যে আদেশ দিয়েছেন, আমি তোমাদেরকে সেই আদেশ স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি।”
وَقَالَ أَيْضًا لِلْعَبَّاسِ عَمِّه
তিনি তাঁর চাচা আব্বাসকে বলেছিলেন: আব্বাস বিন আবদুল মুত্তালিব বিন হাশিম বিন আবদে মানাফ। তিনি একটি অপছন্দনীয় বিষয় দেখে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অবগত করেছিলেন। তিনি জানালেন যে কুরাইশদের কিছু লোক বনি হাশিমের লোকদের প্রতি দুর্ব্যবহার করছে।
الجَفَاء
এর অর্থ হলো, সদাচরণ পরিহার করা এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তখন শপথ করে বললেন: ”ঐ সত্তার শপথ! যাঁর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তারা পূর্ণ ইমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না তারা আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্য এবং আমার সাথে আত্মীয়তার কারণে তোমাদেরকে ভালোবাসবে।” অর্থাৎ দুটি কারণে আহলে বাইতের লোকদেরকে ভালোবাসতে হবে:
১. আহলে বাইতকে ভালোবাসার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার নৈকট্য অর্জন করা যাবে। কেননা তারা আল্লাহর অলিদের অন্তর্ভুক্ত।
২. তারা ছিলেন রাসুলের আত্মীয়। সুতরাং তাদের প্রতি ভালোবাসা পোষণ করলে রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খুশি হবেন এবং এর মাধ্যমে তাঁর প্রতি সম্মানও প্রদর্শিত হয়।
বনি হাশিমের ফজিলত বর্ণনা করতে গিয়ে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন যে, তারা হলেন তাঁরই আত্মীয়। আল্লাহ তাআলা ইসমাঈল বিন ইবরাহিম খলিল (আলাইহিস সালাম)-এর বংশধর হতে উত্তম হিসেবে বনি কিনানাকে নির্বাচন করেছেন। কিনানা একটি গোত্রের নাম — তাদের পূর্বপুরুষ ছিলেন কিনানা বিন খুযাইমা।
কিনানা থেকে বাছাই করেছেন কুরাইশকে — কুরাইশরা হলেন মুযার বিন কিনানার সন্তান। কুরাইশ থেকে আল্লাহ তাআলা বনি হাশিমকে নির্বাচন করেছেন—এরা হলেন হাশিম বিন আবদে মানাফের সন্তান। রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)আরও বলেন: ”অতঃপর আল্লাহ তাআলা আমাকে বনি হাশিম থেকে বাছাই করেছেন।”
▪️রাসুলের বংশপরম্পরা:
মুহাম্মাদ বিন আবদুল্লাহ বিন আবদুল মুত্তালিব বিন হাশিম বিন আবদে মানাফ বিন কুসাই বিন কিলাব বিন মুররাহ বিন কাব বিন লুআই বিন গালিব বিন ফিহির বিন মালিক বিন নযর বিন কিনানা বিন খুযাইমা বিন মুদরিকা বিন ইলয়াস বিন মুযার বিন নায্যার বিন মাআদ বিন আদনান। হাদিস থেকে প্রমাণিত সিদ্ধান্তসমূহ:
উপর্যুক্ত হাদিস থেকে প্রমাণিত হয় যে, আরবদের ফজিলত রয়েছে। কুরাইশ বংশ অন্যান্য আরব গোত্র থেকে উত্তম। বনি হাশিম কুরাইশদের মধ্যে সর্বোত্তম। রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বনি হাশিমের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান — সুতরাং তিনি ব্যক্তিগতভাবে সর্বোত্তম আদম সন্তান এবং তাঁর বংশমর্যাদাও সর্বশ্রেষ্ঠ। এই হাদিসে বনি হাশিমের ফজিলতও সাব্যস্ত হয়েছে। রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আত্মীয়রাই হলেন বনি হাশিম।
গ্রন্থ: শরহুল আকিদাহ আল-ওয়াসিতিয়া
────────
তথ্যসূত্র:
[১] সহিহ মুসলিম।
[২] সহিহ মুসলিম, অধ্যায়: ফাজায়েল, অনুচ্ছেদ: সৃষ্টিকুলের উপর আমাদের নবীর মর্যাদা। হাদিস নং: ৪২২১।
(Collected from haithBD)
────────
গ্রন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন,‌ সৌদি আরব।

ইসলামের ইতিহাসে আজানের সূচনা কীভাবে হল

 আজান (أَذَان) একটি আরবি শব্দ, যার শাব্দিক অর্থ হলো ঘোষণা করা, জানিয়ে দেওয়া বা আহ্বান করা। ইসলামি ইবাদত ও সংস্কৃতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হলো আজান। মদিনায় হিজরতের পর যখন মুসলিমদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে শুরু করল তখন নামাজের সময় হলে মানুষকে একত্রিত করার কোনও নির্দিষ্ট পদ্ধতি ছিল না। সাহাবিগণ প্রায়ই অনুমানের ভিত্তিতে মসজিদে একত্রিত হতেন। এক পর্যায়ে আল্লাহর রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ নিয়ে সাহাবিগণের সাথে পরামর্শে বসলেন যে, কীভাবে মানুষকে নামাজের জন্য ডাকা যায়। পরামর্শ সভায় কেউ কেউ প্রস্তাব করলেন, খ্রিস্টানদের মতো ‘নাকুস’ (ঘণ্টা) বাজাতে, আবার কেউ বললেন ইহুদিদের মতো ‘বুক’ বা শিঙা ফুঁকতে। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই প্রস্তাবগুলো অপছন্দ করলেন। কারণ এগুলো অন্যান্য ধর্মের ঐতিহ্যের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ ছিল।

❑ আবদুল্লাহ ইবনে যায়েদ (রা.)-এর স্বপ্ন:
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন এ নিয়ে চিন্তিত, ঠিক সেই সময়ে আনসারি সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে যায়েদ ইবনে আবদ রাব্বিহি (রা.) একটি স্বপ্ন দেখেন। তিনি রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে এসে বললেন:
“হে আল্লাহর রসুল! আমি স্বপ্নে দেখলাম, এক ব্যক্তি সবুজ রঙের দুটি কাপড় পরে একটি ঘণ্টা হাতে নিয়ে যাচ্ছে।
আমি তাকে বললাম: হে আল্লাহর বান্দা! তুমি কি এই ঘণ্টাটি বিক্রি করবে?
সে বলল: তুমি এটি দিয়ে কী করবে?
আমি বললাম: আমরা এর মাধ্যমে নামাজের জন্য মানুষকে ডাকব।
তখন সে ব্যক্তি বলল: আমি কি তোমাকে এর চেয়ে উত্তম কোনও পদ্ধতির কথা বলব না?
আমি বললাম: অবশ্যই।
তখন সে আমাকে আজানের শব্দগুলো শিখিয়ে দিল।
অতপর তিনি রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সামনে আজানের শব্দগুলো পাঠ করলেন। সেগুলো হল:
اللهُ أَكْبَرُ، اللهُ أَكْبَرُ
(আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার)
“আল্লাহ সবচেয়ে মহান, আল্লাহ সবচেয়ে মহান।”
اللهُ أَكْبَرُ، اللهُ أَكْبَرُ
(আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার)
“আল্লাহ সবচেয়ে মহান, আল্লাহ সবচেয়ে মহান।”
أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ
(আশহাদু আল-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ)
“আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।”
أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ
(আশহাদু আল-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ)
“আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।”
أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللهِ
(আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ)
“আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসুল।”
أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللهِ
(আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ)
“আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসুল।”
حَيَّ عَلَى الصَّلَاةِ
(হায়্যা আলাছ ছলাহ)
“নামাজের জন্য এসো।”
حَيَّ عَلَى الصَّلَاةِ
(হায়্যা আলাছ ছলাহ)
“নামাজের জন্য এসো।”
حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ
(হায়্যা আলাল ফালাহ)
“সাফল্যের জন্য এসো।”
حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ
(হায়্যা আলাল ফালাহ)
“সাফল্যের জন্য এসো।”
اللهُ أَكْبَرُ، اللهُ أَكْبَرُ
(আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার)
“আল্লাহ সবচেয়ে মহান, আল্লাহ সবচেয়ে মহান।”
لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ
(লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ)
“আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।” [সহীহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ৩৭৯]
✪ ফজরের আজানে অতিরিক্ত বাক্য: ‘আস-সালাতু খাইরুম মিনান নাউম’ (ঘুম থেকে সালাত উত্তম):
عن أَبِي مَحْذُورَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: كُنْتُ أُؤَذِّنُ لِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَكُنْتُ أَقُولُ فِي أَذَانِ الْفَجْرِ الْأَوَّلِ: حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ، الصَّلَاةُ خَيْرٌ مِنَ النَّوْمِ، الصَّلَاةُ خَيْرٌ مِنَ النَّوْمِ، اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ.
“আবু মাহজুরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জন্য আজান দিতাম। আমি ফজরের প্রথম আজানে (অর্থাৎ ফজরের ওয়াক্তের আজানে) বলতাম: ‘হাইয়্যা আলাল ফালাহ’ এর পর ‘আস-সালাতু খাইরুম মিনান নাউম, আস-সালাতু খাইরুম মিনান নাউম (ঘুম থেকে সালাত উত্তম), আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’।” [সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নম্বর: ৫০০; সুনানে নাসায়ি, হাদিস নম্বর: ৬৪৭-সহিহ]
▪️একামতের শব্দাবলী:
অন্য বর্ণনায় এসেছে, অতপর তিনি তারপর তিনি অল্প একটু পিছিয়ে দাঁড়ালেন। অতপর বললেন, যখন ইকামত হবে তখন বলবে:
اللهُ أَكْبَرُ اللهُ أَكْبَرُ
(আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার)
أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ
(আশহাদু আল-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ)
أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللهِ
(আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ)
حَيَّ عَلَى الصَّلَاةِ
(হাইয়্যা আলাস সলাহ)
حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ
(হাইয়্যা আলাল ফালাহ)
قَدْ قَامَتِ الصَّلَاةُ، قَدْ قَامَتِ الصَّلَاةُ
(ক্বাদ ক্বামাতিস সলাহ, ক্বাদ ক্বামাতিস সালাহ-)
اللهُ أَكْبَرُ اللهُ أَكْبَرُ
(আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার)
لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ
(লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) [সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নম্বর: ৪৯৯-সহিহ]
❑ প্রথম আজান:
এরপর রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আবদুল্লাহ ইবনে যায়েদ (রা.)-কে নির্দেশ দিলেন যেন তিনি এই শব্দগুলো বেলাল (রা.)-কে শিখিয়ে দেন। তিনি বললেন:
فَقُمْ مَعَ بِلَالٍ فَأَلْقِ عَلَيْهِ مَا رَأَيْتَ، فَلْيُؤَذِّنْ بِهِ، فَإِنَّهُ أَنْدَى صَوْتًا مِنْكَ
“তুমি বেলালের সাথে দাঁড়াও এবং যা দেখেছ তা তাকে বলে দাও, সে যেন এই শব্দগুলো দিয়ে আজান দেয়। কারণ তার কণ্ঠস্বর তোমার চেয়ে অনেক বেশি উচ্চ ও সুমধুর।”
বেলাল (রা.) যখন উচ্চস্বরে এই আজান দিতে শুরু করলেন তখন ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) নিজ ঘর থেকে দ্রুত বের হয়ে আসলেন। তিনি চাদর টেনে টেনে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে এসে বললেন:
وَالَّذِي بَعَثَكَ بِالْحَقِّ لَقَدْ رَأَيْتُ مِثْلَ مَا رَأَى
“সেই সত্তার শপথ যিনি আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন! আমি নিজেও স্বপ্নে অবিকল এমনটিই দেখেছি।” [আবু দাউদ, ৪৯০ সুনানে ইবনে মাজাহ, ৭০৬-সহিহ]
এভাবেই হিজরতের প্রথম বা দ্বিতীয় বছরে ইসলামের ইতিহাসে আজানের মহান এই পদ্ধতির সূচনা হয়। [ইসলামকিউএ, ফাতাওয়া নং-৯৪৭৬]
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি

Translate