Saturday, August 8, 2026

টিকা বা ভ্যাকসিন গ্রহণের বিধান ইসলামী শরীআতের দৃষ্টিতে

 প্রশ্ন: ইসলামী শরী‘আতের দৃষ্টিতে টিকা বা ভ্যাকসিন গ্রহণের বিধান কী? বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে ভ্যাকসিন গ্রহণ করা কি বৈধ? ভ্যাকসিনে হারাম বা নাপাক উপাদান থাকলে তার বিধান কী?

▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য।শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর মূলনীতি হলো, ইসলামী শরী‘আতে চিকিৎসা গ্রহণ করা মূলত বৈধ। রোগ-ব্যাধি থেকে বাঁচতে কিংবা তা নিরাময়ের উদ্দেশ্যে শরী‘আতসম্মত ও উপকারী চিকিৎসা গ্রহণ করা বৈধ। তবে একজন মুসলিমের আক্বীদা হলো—রোগ প্রদানকারী ও আরোগ্যদানকারী একমাত্র মহান আল্লাহ। চিকিৎসা ও ওষুধ হলো কেবল এমন কিছু বৈধ মাধ্যম, যা আল্লাহ তা‘আলা রোগ প্রতিরোধ ও নিরাময়ের জন্য পৃথিবীতে সৃষ্টি করেছেন। অতএব, চিকিৎসা গ্রহণের অর্থ এই নয় যে, চিকিৎসাই স্বয়ং সুস্থতা দান করে; বরং চিকিৎসা গ্রহণ করা হয় আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল রেখে তাঁর নির্ধারিত মাধ্যম অবলম্বনের উদ্দেশ্যে।আল্লাহ তা‘আলা ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেন—وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ“আর আমি যখন অসুস্থ হই, তখন তিনিই আমাকে সুস্থ করেন।”(সূরা আশ-শু‘আরা: ৮০) অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন—قُلْ لَّنْ يُصِيبَنَا إِلَّا مَا كَتَبَ اللَّهُ لَنَا“বলুন, আল্লাহ আমাদের জন্য যা নির্ধারণ করেছেন, তা ছাড়া অন্য কিছুই আমাদের কাছে পৌঁছবে না।”(সূরা আত-তাওবাহ: ৫১) সুতরাং রোগ-ব্যাধি প্রতিরোধ ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে একজন মুমিনের বিশ্বাস হবে—উপকার-অপকার, রোগ-সুস্থতা এবং জীবন-মৃত্যু সবই মহান আল্লাহর ইচ্ছা ও তাকদীরের অধীন।আর চিকিৎসক, কবিরাজ, ওষুধ কিংবা টিকা বা ভ্যাকসিন গ্রহণও যদি কোনো রোগ প্রতিরোধের শরী‘আতসম্মত ও কার্যকর মাধ্যম হয়, তাহলে তা গ্রহণের বিধান নির্ধারণ করতে হবে এর উপাদান, প্রস্তুতপ্রণালী, কার্যকারিতা এবং শরী‘আতের অন্যান্য মূলনীতির আলোকে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ রোগ ও ঔষধ অবতীর্ণ করেছেন এবং প্রতিটি রোগের ঔষধ সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং তোমরা ঔষধ গ্রহণ করো; তবে হারাম ঔষধ নয়।”[হাদীসটি আবু দাউদ (৩৩৭৬) বর্ণনা করেন] এছাড়া উসামা ইবনে শারীক রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: বেদুঈনরা বলল: হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি চিকিৎসা নিব না? তিনি বললেন: “তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ করো। কেননা মহামহিম আল্লাহ এমন কোন রোগ রাখেননি যার প্রতিষেধক রাখেননি; একটি রোগ ছাড়া।” তারা বলল: ইয়া রাসূলুল্লাহ! তা কি? তিনি বললেন: বার্ধক্য।[হাদীসটি তিরমিযী (৪/৩৮৩) বর্ণনা করেছেন, হাদীস নং: ১৯৬১। তিনি বলেন: হাদীসটি হাসান সহীহ।ইমাম আলবানী সহীহুল জামে গ্রন্থে (২৯৩০) হাদীসটি রয়েছে] আরেক বর্ননায়,জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ‘প্রত্যেকটি রোগের চিকিৎসা রয়েছে। কোনো রোগে যদি সঠিক ঔষধ প্রয়োগ করা হয়, তাহলে মহান আল্লাহর হুকুমে আরোগ্য লাভ হয়।’[হাদীসটি মুসলিম (২২০৪) বর্ণনা করেন]
.
বিগত শতদীয় অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম ইমাম আব্দুল আজিজ ইবনে বায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:إن الله جل وعلا ما أنزل داء إلا وأنزل له شفاء، علمه من علم وجهله من جهل، وأن الله سبحانه وتعالى جعل فيما أنزل على نبيه صلى الله عليه وسلم – من الكتاب والسنة – العلاج لجميع ما يشكو منه الناس، من أمراض حسية ومعنوية، وقد نفع الله بذلك العباد، وحصل به من الخير ما لا يحصيه إلا الله عز وجل “আল্লাহ তা’আলা এমন কোনো রোগ নাযিল করেননি যার কোনো ঔষধ তিনি নাযিল করেননি। কেউ সে ঔষধ জানে, আর কেউ সে ঔষধ জানে না। মহান আল্লাহ তার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি যে কুরআন-সুন্নাহ অবতীর্ণ করেছেন তাতে মানুষের যত সব রোগের অভিযোগ করে সকল দৈহিক ও আত্মিক রোগের চিকিৎসা রেখেছেন। আল্লাহ এর মাধ্যমে তার বান্দাদের উপকার করেছেন। এর মাধ্যমে এমন কল্যাণ সাধিত হয়েছে যার পরিমাণ আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।”[ফাতাওয়া ইবনে বায; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৪৫৩]
.
ইবনুল কাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:في الأحاديث الصحيحة الأمر بالتداوي ، وأنه لا ينافي التوكل ، كما لا ينافيه دفع الجوع والعطش والحر والبرد بأضدادها ، بل لا تتم حقيقة التوحيد إلا بمباشرة الأسباب التي نصبها الله مقتضيات لمسبباتها قدراً وشرعاً ، وأن تعطيلها يقدح في نفس التوكل ، كما يقدح في الأمر والحكمة ، ويضعفه من حيث يظن معطلها أن تَرْكها أقوى في التوكل ، فإن تَرْكها عجز ينافي التوكل الذي حقيقته اعتماد القلب على الله في حصول ما ينفع العبد في دينه ودنياه ، ودفع ما يضره في دينه ودنياه ، ولا بد مع هذا الاعتماد من مباشرة الأسباب ، وإلا كان معطلاً للحكمة والشرع ، فلا يجعل العبد عجزه توكلاً ، ولا توكله عجزاً “বিশুদ্ধ হাদীসসমূহে চিকিৎসা গ্রহণ করার নির্দেশ এসেছে। এটি তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয়। যেমনিভাবে ক্ষুধা, পিপাসা, গরম, ঠাণ্ডা প্রতিহত করা তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী বিষয় না। বরং আল্লাহর সৃষ্টিগত ও শরঈ তাকদীর অনুসারে ফলাফল পেতে হলে তিনি যে সমস্ত কারণ বা উপায় নির্ধারণ করে দিয়েছেন, সেগুলো গ্রহণের মাধ্যমেই তাওহীদ বাস্তবায়িত হবে। এগুলোকে গ্রহণ না করা তাওয়াক্কুলের বিপরীত, আবার আল্লাহর নির্দেশ ও প্রজ্ঞারও বিপরীত। এগুলো যে ব্যক্তি পরিত্যাগ করে সে মনে করে যে পরিত্যাগ করা তাওয়াক্কুলকে দৃঢ় করে। বস্তুত এ ধরনের পরিত্যাগ করা অক্ষমতা; যা তাওয়াক্কুলের বিপরীত। তাওয়াক্কুলের স্বরূপ হলো বান্দার দ্বীন-দুনিয়ার উপকার হয় এমন কিছু অর্জনে এবং দ্বীন-দুনিয়ার ক্ষতি হয় এমন কিছু প্রতিহত করার ক্ষেত্রে অন্তর আল্লাহর উপর নির্ভর করা। এই নির্ভরতার ক্ষেত্রে অবশ্যই মাধ্যম বা উপকরণ অবলম্বন করতে হবে। নতুবা ব্যক্তি প্রজ্ঞা ও শরীয়ত পরিত্যাগ করবে। সুতরাং ব্যক্তি যেন তার অক্ষমতাকে তাওয়াক্কুল কিংবা তাওয়াক্কুলকে অক্ষমতা বানিয়ে না দেয়।”[যাদুল মা‌আদ (৪/১৫), দেখুন: আল-মাউসুয়াতুল ফিকহিয়্যা (১১/১১৬)]
.
প্রথমত: টিকা বা ভ্যাকসিন গ্রহণের বিধান সম্পর্কে কথা হলো: টিকা বা ভ্যাকসিন (التلقيح), যাকে প্রতিরোধমূলক টিকাদান (التحصين) বা টিকাপ্রদান (التطعيم) বলা হয়, মূলত একটি প্রতিরোধমূলক চিকিৎসাব্যবস্থা। এর মাধ্যমে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে সক্রিয় ও শক্তিশালী করা হয়। টিকা গ্রহণের ফলে শরীরে নির্দিষ্ট রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি (প্রতিরোধী দেহ) তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে ওই রোগের সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে অথবা রোগে আক্রান্ত হলেও তার তীব্রতা ও জটিলতা কমাতে সহায়তা করে। অর্থাৎ, টিকার উদ্দেশ্য রোগ সৃষ্টি করা নয়; বরং রোগে আক্রান্ত হওয়ার আগেই শরীরকে সেই রোগের বিরুদ্ধে প্রস্তুত ও সুরক্ষিত করা। টিকা নেওয়ার পর সাময়িকভাবে সামান্য কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে, তবে তা সাধারণত অল্প সময়ের মধ্যেই সেরে যায়।পক্ষান্তরে, আল্লাহ তা‘আলার ইচ্ছায় টিকার মাধ্যমে অর্জিত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ভবিষ্যতে বিভিন্ন সংক্রামক ও গুরুতর রোগ থেকে সুরক্ষা লাভ এবং রোগের জটিলতা ও ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
.
আরব বিশ্বকোষে বলা হয়েছে:التحصين ( التمنيع ) النشط ، مصطلح آخر للتلقيح ، ويحتوي اللقاح على مواد من شأنها تحفيز المناعة في الجسم لإنتاج أجسام مضادة لمرض معد معين ، وهذه الأجسام المضادة تحمي الشخص إذا ما أصيب بالكائن الحي المسبب للمرض .ويحتوي اللقاح على مادة قوية تكفي للبدء في إفراز الأجسام المضادة ، ولكنها ليست بالقوة التي تسبب المرض فعلاً ، ومعظم اللقاحات تحتوي على البكتيريا المسببة للمرض أو فيروسات ميتة ، ويحتوي بعضها الآخر على الجراثيم الحية ، ولكن في حالة ضعيفة حتى لا تسبب المرض ، وتُعرف اللقاحات باسم ” الذوفانات ” ، حيث تُصنّع من سموم تفرزها الكائنات المسببة للمرض ، وتُعالج هذه السموم كيميائيّاً بحيث تعطي المناعة دون أن تسبب المرض .
“সক্রিয় টিকাদান (রোগপ্রতিরোধ/অনাক্রম্যকরণ) হলো টিকা দেওয়ারই আরেকটি পরিভাষা। টিকার মধ্যে এমন কিছু উপাদান থাকে যা নির্দিষ্ট কোনো সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি উৎপাদনে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে উদ্দীপিত করে। ব্যক্তি রোগ সৃষ্টিকারী সেই রোগজীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হলে এই অ্যান্টিবডিগুলো তাকে সুরক্ষা প্রদান করে।টিকার মধ্যে অ্যান্টিবডি উৎপাদন শুরু করার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী উপাদান থাকে, তবে তা বাস্তবে রোগ সৃষ্টির মতো শক্তিশালী নয়। বেশিরভাগ টিকাতেই রোগ সৃষ্টিকারী মৃত ব্যাকটেরিয়া অথবা মৃত ভাইরাস ব্যবহার করা হয়; আর কিছু টিকায় জীবিত জীবাণু থাকে, তবে তা এতটাই দুর্বল অবস্থায় থাকে যে সেগুলো রোগ সৃষ্টি করতে পারে না।এছাড়া কিছু টিকা ‘টক্সয়েড’ (ذوفانات) নামে পরিচিত, যা রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু কর্তৃক নিঃসৃত বিষাক্ত পদার্থ থেকে প্রস্তুত করা হয়।পরে এসব বিষকে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় এমনভাবে পরিবর্তন করা হয়, যাতে তা রোগ সৃষ্টি না করেই শরীরে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে।”
.
দ্বিতীয়ত: টিকা গ্রহণের শরয়ী বিধান নির্ভর করে এতে ব্যবহৃত উপাদান এবং এর ফলে সৃষ্ট প্রভাবের ওপর। এ দিক থেকে টিকাকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়।
.
প্রথম প্রকার: যেসব টিকায় ব্যবহৃত উপাদান মূলত বৈধ ও শরী‘আতসম্মত এবং যার উপকারিতা পরীক্ষিত, প্রমাণিত ও সুস্পষ্ট—এ ধরনের টিকা গ্রহণে শরী‘আতের দৃষ্টিতে বৈধ; এতে কোনো প্রকার আপত্তি নেই। বরং রোগ-ব্যাধি প্রতিরোধ ও মানুষের জীবন সুরক্ষায় এগুলো আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য এক মহান নিয়ামত। চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির ফলে অতীতে যেসব ভয়াবহ সংক্রামক রোগ ও মহামারী অসংখ্য মানুষের প্রাণহানি ঘটিয়েছে, সেগুলোর বিস্তার প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রায় নির্মূল করাও সম্ভব হয়েছে।
.
শাইখ সা‘দ ইবনে নাসির শাসরী বলেছেন:ومن المسائل المتعلقة بالأوبئة والأمراض المعدية : حُكم أخذ اللقاح الذي يعطى من أجل الوقاية من هذه الأمراض ، فنقول : اللقاح الذي يُعطى على نوعين :النوع الأول : ما عرف أثره بالتجربة أنه يقي بإذن الله من هذا المرض ، ومثل هذا له أحكام العلاج وهو نوع من أنواع العلاج ؛ وذلك لدخوله في قوله صلى الله عليه وسلم ( تداووا ) ، فيأخذ حكم التداوي ، وبعض الفقهاء استشكل أخذ اللقاح وقال : إن هذا اللقاح مرض مخفَّف يُنقل إلى الجسد ليتمكن الجسم من محاربة المرض الثقيل ( ليتعود البدن على مقاومة المرض ) ، قالوا : فكيف نستجيز إدخال مرض إلى الجسد ؟ والأظهر : أن هذا العمل لا حرج فيه ، بل هو من القربات ؛ لأن إدخال الضرر هنا لا يترتب عليه ضرر بل يترتب عليه مصلحة لوقاية متعاطي هذا اللقاح من المرض الشديد ، فهذا دليل على عدم المنع من أخذ هذا اللقاح “মহামারী ও সংক্রামক রোগ-সংক্রান্ত মাসআলাগুলোর মধ্যে একটি হলো এসব রোগ থেকে সুরক্ষার জন্য প্রদত্ত টিকা (ভ্যাকসিন) দেওয়া হয়, তার হুকুম।আমরা বলি, এ ধরনের টিকা দুই প্রকার:প্রথম প্রকার: যে টিকার কার্যকারিতা অভিজ্ঞতা ও পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে, আল্লাহর ইচ্ছায় এটি রোগ থেকে সুরক্ষা দেয়। এ ধরনের টিকার বিধান চিকিৎসার বিধানের অন্তর্ভুক্ত। এটি চিকিৎসারই একটি প্রকার। কারণ, এটি নবী (ﷺ) -এর এই নির্দেশনার অন্তর্ভুক্ত, “তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ করো।”অতএব, এটি চিকিৎসারই হুকুম বহন করবে।তবে কিছু ফকীহ টিকা গ্রহণের বিষয়ে আপত্তি করেছেন। তারা বলেছেন, এই টিকায় রোগের দুর্বল জীবাণু শরীরে প্রবেশ করানো হয়, যাতে শরীর পরবর্তীতে শক্তিশালী রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে অর্থাৎ শরীরকে রোগ প্রতিরোধে অভ্যস্ত করা হয়। তারা বলেন, আমরা কীভাবে শরীরে ইচ্ছাকৃতভাবে একটি রোগ প্রবেশ করানোকে বৈধ বলতে পারি?‌ কিন্তু অধিক শক্তিশালী মত হলো, এতে কোনো অসুবিধা নেই বরং এটি সওয়াবের কাজ। কারণ এখানে যে সামান্য ক্ষতি দেখা যায়, তা প্রকৃতপক্ষে ক্ষতির জন্য নয় বরং এর মাধ্যমে বড় উপকার অর্জিত হয়। অর্থাৎ, টিকা গ্রহণকারীকে মারাত্মক রোগ থেকে রক্ষা করার স্বার্থেই এটি করা হয়। সুতরাং, এ ধরনের টিকা গ্রহণে নিষেধাজ্ঞার কোনো কারণ নেই।‘(আহকাম ফিকহিয়্যাহ তাআতাল্লাকু বিল-আওবিয়াহ’ বা মহামারী সম্পর্কিত ফিকহি বিধান শীর্ষক আলোচনা থেকে সংগৃহীত) এছাড়া, টিকায় ব্যবহৃত বৈধ উপাদান ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা অন্য যেকোনো উৎসের হোক না কেন যদি তা উপকারী ও প্রশংসনীয় ফল বয়ে আনে, তবে তা গ্রহণ করা বৈধ। বিষাক্ত পদার্থ দ্বারা চিকিৎসা এবং সেগুলো টিকায় ব্যবহারের বিধান সম্পর্কে ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং ১০৯৪২৪-এর উত্তরও দেখা যেতে পারে।
.
দ্বিতীয় প্রকার: যেসব টিকায় ব্যবহৃত উপাদান মূলত বৈধ হলেও, সেগুলোর ক্ষতি উপকারের চেয়ে বেশি, অথবা আদৌ কোনো উপকারই প্রমাণিত নয়। এ ধরনের টিকা গ্রহণ করা নিঃসন্দেহে বৈধ নয়। কারণ শরীয়ত আমাদেরকে খাদ্য, পানীয়, ওষুধ বা অন্য যেকোনো উপায়ে নিজের ক্ষতি করা থেকে নিষেধ করেছে।এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে দেখুন ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং২০২৭৬-এর উত্তরও দেখুন।
.
তৃতীয় প্রকার: এমন টিকা, যার মূল উপাদান হারাম বা নাপাক ছিল কিন্তু পরে তা রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিবর্তিত হয়েছে, অথবা এর সঙ্গে এমন কিছু উপাদান মিশানো হয়েছে, যার ফলে এর নাম, বৈশিষ্ট্য ও প্রকৃতি সম্পূর্ণ বদলে গিয়ে তা বৈধ (হালাল) পদার্থে পরিণত হয়েছে। ইসলামী পরিভাষায় একে “ইস্তিহালা” বলা হয়। ইস্তেহালা বলতে বোঝানো হয় বস্তুর স্বীয় বৈশিষ্ট্য রূপান্তরিত হয়ে যাওয়া ও বদলে যাওয়া।[আল-মাউসুয়াতুল ফিকহিয়্যাহ (৩/২১৩) থেকে সমাপ্ত] এ ধরনের টিকার উপকারী প্রভাবও রয়েছে। বহু সংখ্যক আলেমের মতে যদি নাপাকির রূপ বদলে অন্য কিছু হয়ে যায় তাহলে এগুলোর থেকে নাপাকির কারণ দূর হয়ে যায় এবং এগুলোকে পাক হিসেবে হুকুম প্রদান করা হয়। ক্বারাফী রাহিমাহুল্লাহু তা’আলা বলেন: ‘কেননা আলেমদের ঐকমত্য রয়েছে যে, আল্লাহ কোনো বস্তুকে কেবল সত্তাগত এবং আকৃতিগত কারণে নাপাক বা নাপাকিযুক্ত বলে ঘোষণা দেননি। বরং বস্তুর সত্তায় স্থান গ্রহণ করা বিশেষ গুণের জন্যই আল্লাহ কোনো বস্তুকে নাপাক বলে গণ্য করেছেন। সেটি হতে পারে: বিশেষ রং ও বিশেষ কোনো অবস্থা। যদি সেই বিশেষ অবস্থা ও গুণ বিলুপ্ত হয়ে যায়, তাহলে হারাম হওয়াকে অবধারিত করে এমন কিছুর অনুপস্থিতির কারণে হারামের বিধানও নাকচ হয়ে যাবে।’[আল-ফুরুক (২/২০৭) থেকে সমাপ্ত]
.
আরব বিশ্বকোষে বলা হয়েছে: وما زالت بعض اللقاحات تصنع من أجزاء أو إفرازات الكائنات المسببة للمرض ، وتتكون مجموعة لقاحات أخرى من كائنات حية تشابه تلك التي تسبب المرض ، وهذه الكائنات تعطي المناعة ولكنها لا تسبب الأمراض”এখনও কিছু টিকা রোগ-সৃষ্টিকারী জীবাণুর অংশবিশেষ বা তাদের নিঃসৃত পদার্থ থেকে তৈরি করা হয়। আবার অন্য কিছু টিকা এমন জীবন্ত অণুজীব দ্বারা প্রস্তুত করা হয়, যেগুলো রোগ-সৃষ্টিকারী জীবাণুর অনুরূপ। এসব অণুজীব শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সৃষ্টি করে, কিন্তু নিজেরা রোগ সৃষ্টি করে না। এ ধরনের টিকা গ্রহণ করা বৈধ। কারণ, ইস্তিহালা এর মাধ্যমে এর উপাদানের নাম ও বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত হয়ে যাওয়ায় এর বিধানও পরিবর্তিত হয়েছে এবং তা ব্যবহার করা বৈধ হয়েছে।”
.
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়াহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: وأما دخان النجاسة : فهذا مبني على أصل وهو أن العين النجسة الخبيثة إذا استحالت حتى صارت طيبة كغيرها من الأعيان الطيبة – مثل أن يصير ما يقع في الملاحة من دم وميتة وخنزير ملحا طيبا كغيرها من الملح …ففيه للعلماء قولان : أحدهما : لا يطهر ، كقول الشافعي ، وهو أحد القولين في مذهب مالك ، وهو المشهور عن أصحاب أحمد وإحدى الروايتين عنه ، والرواية الأخرى : أنه طاهر ، وهذا مذهب أبي حنيفة ومالك في أحد القولين وإحدى الروايتين عن أحمد ومذهب أهل الظاهر وغيرهم : أنها تطهر ، وهذا هو الصواب المقطوع به ؛ فإن هذه الأعيان لم تتناولها نصوص التحريم لا لفظاً ولا معنى ، فليست محرَّمة ولا في معنى المحرَّم فلا وجه لتحريمها بل تتناولها نصوص الحل ؛ فإنها من الطيبات ، وهي أيضا في معنى ما اتفق على حله فالنص والقياس يقتضي تحليلها “নাপাক বস্তুর ধোঁয়া সম্পর্কিত মাসআলাটি একটি মৌলিক নীতির ওপর নির্ভরশীল। তা হলো যদি কোনো নাপাক ও অপবিত্র বস্তু এমনভাবে রূপান্তরিত হয়ে যায় যে তা অন্যান্য পবিত্র বস্তুর মতোই একটি পবিত্র বস্তুতে পরিণত হয়, যেমন লবণের খনিতে পড়ে থাকা রক্ত, মৃত প্রাণী বা শূকর সম্পূর্ণ রূপান্তরিত হয়ে বিশুদ্ধ লবণে পরিণত হয়। এ বিষয়ে আলেমদের দুটি মত রয়েছে। একদল বলেন, তা পবিত্র হবে না। এটি ইমাম শাফেয়ীর মত, ইমাম মালিকের একটি মত এবং ইমাম আহমাদের মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত। অপর দল বলেন, তা পবিত্র হয়ে যায়। এটি ইমাম আবু হানিফার মত, ইমাম মালিকের একটি মত এবং ইমাম আহমাদের অপর বর্ণিত মত। আহলে জাহিরসহ আরও অনেক আলেমের মতও এটাই যে, এ ধরনের বস্তু পবিত্র হয়ে যায়। এটিই সঠিক ও নিশ্চিত মত। কারণ, এসব রূপান্তরিত বস্তুকে হারাম বলার মতো কোনো কুরআন-সুন্নাহের দলিল নেই, না শব্দগতভাবে, না অর্থগতভাবে। সুতরাং এগুলো হারাম নয় এবং হারামের অন্তর্ভুক্তও নয়। তাই এগুলোকে হারাম বলার কোনো ভিত্তি নেই। বরং এগুলো হালাল ও পবিত্র বস্তুর অন্তর্ভুক্ত। কুরআন-সুন্নাহর দলিল এবং কিয়াস উভয়ই এগুলোর বৈধতা প্রমাণ করে।” (ইবনু তাইমিয়া; মাজমূউল ফাতাওয়া: ২১/৭০–৭১)।
.
ইবনুল কাইয়্যিম রাহিমাহুল্লাহ বলেন: ‘এই মূলনীতির উপর ভিত্তি করে মদ রূপান্তরিত হওয়ার মাধ্যমে তা পবিত্র হয়ে যাওয়াটা কিয়াসের দাবী। নিকৃষ্টতার বৈশিষ্ট্যের কারণে মদ নাপাক। নিকৃষ্টতা দূর হয়ে গেলে নাপাকিও দূর হয়ে যায়। শরীয়তের সকল উৎস ও ফলাফলের ক্ষেত্রে এটিই মূলনীতি। বরং নেকী ও শাস্তির ক্ষেত্রেও এটি প্রধান নীতি।সুতরাং সঠিক কিয়াস হচ্ছে অন্যান্য সকল নাপাকিও রূপান্তরিত হলে সেগুলোর ক্ষেত্রেও একই বিধান প্রয়োগ করা। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের মসজিদের স্থান থেকে মুশরিকদের কবরগুলো উপড়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু মাটি সরিয়ে ফেলেননি। মহান আল্লাহ দুধের ব্যাপারে জানিয়েছেন যে দুধ রক্ত ও গোবরের মধ্য থেকে বের হয়। মুসলিমরা এ ব্যাপরে একমত যে কোনো প্রাণী যদি নাপাক খাদ্য গ্রহণ করার পর তাকে বেঁধে রাখা হয় এবং প্রাণীটি পাক খাদ্য গ্রহণ করে, তাহলে তার দুধ ও গোশত হালাল। অনুরূপভাবে শস্য ও ফল নাপাক পানি দিয়ে সেচ দেওয়ার পরে যদি পাক পানি দিয়ে সেচ দেওয়া হয় তাহলে সেই শস্যও হালাল। নাপাকির বৈশিষ্ট্য রূপান্তরিত হয়ে পবিত্র বৈশিষ্ট্য চলে আসার কারণে।এর বিপরীতে যদি পবিত্র বস্তু নাপাকিতে রূপান্তরিত হয়, তাহলে বস্তুটি নাপাক হয়ে যায়। যেমন: পানি ও খাবার যখন পেশাব ও পায়খানায় রূপ নেয়। তাই পবিত্র বস্তু নাপাকিতে রূপান্তরিত হলে এর প্রভাব থাকলে, নাপাক বস্তু পবিত্র বস্তুতে রূপান্তরিত হলে এর প্রভাব থাকবে না কেন? আল্লাহ তাআলা পবিত্র থেকে নাপাক ও নাপাক থেকে পবিত্রকে বের করেন। এখানে মূল অবস্থা বিবেচ্য নয়। বরং বস্তুর বৈশিষ্ট্য বিবেচ্য।…’ [ই’লামুল মুওয়াক্কি’ঈন (৩/১৮৩) থেকে সমাপ্ত]
.
চতুর্থ প্রকার: যেসব টিকা এমন উপাদান দ্বারা তৈরি, যা ক্ষতিকর বা হারাম, এবং সেগুলোর উপকারিতা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয় বরং চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এগুলোর কার্যকারিতা ও উপকারিতা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। এ ধরনের টিকা গ্রহণ করা জায়েয নয়। কারণ এতে নিজের জীবন ও স্বাস্থ্যের ক্ষতির ঝুঁকি রয়েছে।আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাপাক ঔষধ সম্পর্কে নিষেধ করেছেন।[হাদীসটি তিরমিযী (২০৪৫) বর্ণনা করেন। শাইখ আলবানী এটিকে সহিহ বলে গণ্য করেন] অপর বর্ননায় আবুদ-দারদা বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “আল্লাহ রোগ ও ঔষধ অবতীর্ণ করেছেন। প্রত্যেক রোগের জন্য তিনি ঔষধ রেখেছেন। সুতরাং তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ করো। তবে হারাম দিয়ে চিকিৎসা গ্রহণ করো না।”[হাদীসটি আবু দাউদ (৩৮৭৪) বর্ণনা করেন।] শাইখ আলবানী রাহিমাহুল্লাহ বলেন: সমার্থক আরো কিছু হাদীসের কারণে হাদীসটির ভাব সহিহ।[আত-তা’লীক্বাতুর রাদ্বিয়্যাহ ‘আলার-রাউদ্বাহ আন-নাদিয়্যাহ (৩/১৫৪) থেকে সমাপ্ত]
.
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ বলেন: التّداوي بالمحرّمات النّجسة محرّم ؛ لأنّ الأدلّة الدّالّة على التّحريم مثل قوله تعالى : ( حُرِّمَتْ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةُ ) ، وحديث : ( كُلُّ ذِي نَابٍ مِن السِّبَاعِ حَرَامٌ ) ، وقوله تعالى : ( إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ ) عامّة في حال التّداوي وغير التّداوي ، فمن فرّق بينهما فقد فرّق بين ما جمع اللّه بينه وخص العموم ؛ وذلك غير جائز”নাপাক হারাম বস্তু দিয়ে চিকিৎসা গ্রহণ করা হারাম। কারণ হারামের বিধান আরোপকারী দলীলসমূহ যেমন আল্লাহর বাণী: حُرِّمَتْ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةُ “তোমাদের জন্য মৃত প্রাণীকে (খাওয়া) হারাম করা হয়েছে” কিংবা হাদিস: ‘প্রত্যেক শিকারী দাঁত বিশিষ্ট হিংস্র জন্তু হারাম’ কিংবা আল্লাহর বাণী:“মদ, জুয়া, মূর্তি ও ভাগ্য নির্ণয়ের তীর এগুলো নাপাক।” এই আয়াত ও হাদীসগুলো চিকিৎসার ক্ষেত্রে ও চিকিৎসা ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রের জন্য আম (সাধারণ)। তাই যে ব্যক্তি এই দুটি ক্ষেত্রের মাঝে পার্থক্য করল, সে এমন দুটি বিষয়ের মাঝে পার্থক্য করল আল্লাহ যে দুটোকে একত্রিত করেছেন এবং আম (সাধারণ)-কে খাস (নির্দিষ্ট) করল। এমনটি করা জায়েয নয়।[মাজমুউল ফাতাওয়া (২১/৫৬২) থেকে ঈষৎ পরিবর্তনসহ]
.
ইবনুল কাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহু) তাআলা বলেন:والمعالجة بالمحرمات قبيحة شرعاً وعقلاً .أما الشرع فما ذكرنا من هذه الأحاديث وغيرها .وأما العقل ، فهو أن الله سبحانه إنما حرمه لخبثه ، فإنه لم يُحَرِّم على هذه الأمة طيباً عقوبة لها ، كما حرمه على بني إسرائيل بقوله : ( فَبِظُلْمٍ مِّنَ الَّذِينَ هَادُوا حَرَّمْنَا عَلَيْهِمْ طَيِّبَاتٍ أُحِلَّتْ لَهُمْ ) ؛ وإنما حرَّم على هذه الأمة ما حرَّم لخبثه ، وتحريمه له حِمية لهم ، وصيانة عن تناوله ، فلا يناسب أن يُطلب به الشفاء من الأسقام والعلل ، فإنه وإن أثَّر في إزالتها ، لكنه يُعقب سقماً أعظم منه في القلب بقوة الخبث الذي فيه ، فيكون المُدَاوَى به قد سعى في إزالة سقم البدن بسقم القلب “
“হারাম বস্তু দিয়ে চিকিৎসা গ্রহণ করা শরীয়ত ও আকল উভয় দৃষ্টিকোণ থেকে নিন্দনীয়। শরীয়তের দৃষ্টি থেকে নিন্দনীয় হওয়ার কারণ আমাদের উল্লেখিত পূর্বোক্ত হাদীসসমূহ ও অন্যান্য হাদিসসমূহ। আর আকলের দৃষ্টি থেকে নিন্দনীয় হওয়ার কারণ এই যে মহান আল্লাহ এটাকে খারাপ হওয়ার কারণেই হারাম করেছেন। তিনি এই উম্মতকে শাস্তি দেওয়ার জন্য কোনো ভালো জিনিসকে হারাম করেননি; যেমনটি বনী ইসরাইলের ক্ষেত্রে করেছিলেন। আল্লাহ সে প্রসঙ্গে বলেন: “(প্রথমে) বৈধ করা হয়েছিল এমন কতিপয় ভালো জিনিস আমি তাদের জন্য (ইহুদিদের জন্য) অবৈধ করে দিয়েছি তাদের যুলুমের কারণে।” বরং আল্লাহ এই উম্মতের জন্য যা হারাম করেছেন তা খারাপ হওয়ার কারণেই হারাম করেছেন। তিনি তাদেরকে এগুলো গ্রহণ করা থেকে রক্ষা করার জন্য হারাম করেছেন। সুতরাং এগুলোর মাধ্যমে রোগ-বিমার থেকে চিকিৎসা গ্রহণ অন্বেষণ করা উপযুক্ত নয়। কেননা যদি রোগ দূর করার ক্ষেত্রে এগুলোর প্রভাব থাকেও তবুও এগুলোর খারাপ দিক শক্তিশালী হওয়ার কারণে অন্তরের উপর গুরুতর আরেক রোগ রেখে যাবে। ফলে এগুলোর দ্বারা চিকিৎসা গ্রহণকারী ব্যক্তি যেন অন্তরকে রোগাক্রান্ত করার মাধ্যমে দেহের রোগ দূর করল।’[যাদুল মা’আদ: ৪/১৪৩) থেকে সমাপ্ত]
.
শাইখ সা‘দ ইবনে নাসির শাসরী (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন:ومن المسائل المتعلقة بالأوبئة والأمراض المعدية حكم أخذ اللقاح الذي يعطى من أجل الوقاية من هذه الأمراض ، فنقول اللقاح الذي يعطى على نوعين :النوع الأول : … – سبق ذِكره قريباً – .النوع الثاني من لقاح الأمراض المعدية : ما لم يُتأكد من أثره ولم يعرف بالتجربة بعدُ ، أو اختلف كلام الأطباء فيه بحيث لم يعتمد الإنسان على شيء ولم يترجح لديه شيء من أقوالهم : فحينئذ الأصل : المنع من أخذه وعدم جوازه ؛ لأنه لم يتأكد من تأثيره في الوقاية من المرض ، فنحن تأكدنا من أنه مضر ، وأنه يدخل على البدن شيئاً من الضرر ولم نتأكد من أن له فائدةً أعظم منه ، ومن ثَمَّ فإننا نمنع منه ، لأننا لا نستجيز الإقدام على فعل إلا إذا كان نفعه أكبر من ضرره ، فما لم نتأكد من ذلك فالأصل منعه ، إذا كان الفعل نتأكد ونجزم بأنه مضر وأن ما يقابل هذا الضرر من الفائدة لم يثبت بعد : فحينئذ يمنع منه ” . انتهى من محاضرة بعنوان ” أحكام فقهية تتعلق بالأوبئة “মহামারী ও সংক্রামক রোগ-সম্পর্কিত মাসআলাগুলোর একটি হলো এসব রোগ থেকে বাঁচার জন্য যে টিকা দেওয়া হয়, তার হুকুম কী? আমরা বলি, এ ধরনের টিকা দুই প্রকার:প্রথম প্রকার: (এর আলোচনা ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে।) দ্বিতীয় প্রকার: সংক্রামক রোগের এমন টিকা, যার কার্যকারিতা এখনো নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি, অথবা পর্যাপ্ত পরীক্ষার মাধ্যমে এর ফলাফল জানা যায়নি। কিংবা চিকিৎসকদের মধ্যে এ নিয়ে এমন মতভেদ রয়েছে যে, মানুষ কোনো একটি মতকে নির্ভরযোগ্য বলে গ্রহণ করতে পারে না এবং কোনো মতই তার কাছে প্রাধান্য পায় না। এ অবস্থায় মূলনীতি হলো এ ধরনের টিকা গ্রহণ করা নিষিদ্ধ এবং জায়েয নয়। কারণ, এর মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধের কার্যকারিতা নিশ্চিত নয়। অথচ আমরা নিশ্চিত যে, এটি শরীরে কিছু না কিছু ক্ষতি সৃষ্টি করে। কিন্তু সেই ক্ষতির চেয়ে বড় কোনো উপকারিতা এতে আছে তা প্রমাণিত নয়।সুতরাং আমরা এ ধরনের টিকা থেকে বিরত থাকতে বলি। কেননা, কোনো কাজ তখনই বৈধ হয় যখন তার উপকারিতা ক্ষতির তুলনায় বেশি হয়। যতক্ষণ পর্যন্ত তা নিশ্চিত না হয়, ততক্ষণ মূলনীতি হলো তা থেকে বিরত থাকা। অর্থাৎ, যখন আমরা নিশ্চিত যে কাজটি ক্ষতিকর, কিন্তু সেই ক্ষতির বিপরীতে যে উপকারিতা দাবি করা হচ্ছে তা এখনো প্রমাণিত নয় তখন তা গ্রহণ করা নিষিদ্ধ হবে।”(https://web.archive.org/…/201106042…/www.al-adwa.net/…)
.
বিগত শতদীয় অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম ইমাম আব্দুল আজিজ ইবনে বায (রাহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: রোগ হওয়ার আগেই প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা, যেমন টিকা গ্রহণ করার হুকুম কী?
তিনি উত্তরে বলেন :لا بأس بالتداوي إذا خشي وقوع الداء لوجود وباء أو أسباب أخرى يخشى من وقوع الداء بسببها : فلا بأس بتعاطي الدواء لدفع البلاء الذي يخشى منه لقول النبي صلى الله عليه وسلم في الحديث الصحيح : ” من تصبح بسبع تمرات من تمر المدينة لم يضره سحر ولا سم ” ، وهذا من باب دفع البلاء قبل وقوعه فهكذا إذا خشي من مرض وطُعم ضد الوباء الواقع في البلد أو في أي مكان لا بأس بذلك من باب الدفاع كما يعالج المرض النازل بالدواء ، لكن لا يجوز تعليق التمائم والحجب ضد المرض أو الجن أو العين لنهي النبي صلى الله عليه وسلم عن ذلك ، وقد أوضح عليه الصلاة والسلام أن ذلك من الشرك الأصغر فالواجب الحذر من ذلك “যদি মহামারী বা অন্য কোনো কারণে রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা গ্রহণে কোনো অসুবিধা নেই। এমন বিপদের আশঙ্কা থাকলে তা প্রতিরোধের জন্য ওষুধ গ্রহণ করা জায়েয। এর প্রমাণ হলো, নবী সা.-এর সহীহ হাদীস: যে ব্যক্তি সকালে মদীনার সাতটি আজওয়া খেজুর খাবে, সেদিন তাকে কোনো বিষ বা জাদু ক্ষতি করতে পারবে না।এটি বিপদ আসার আগেই তা প্রতিরোধ করার অন্তর্ভুক্ত।‌ অনুরূপভাবে, যদি কোনো দেশে বা এলাকায় মহামারী ছড়িয়ে পড়ে এবং কেউ সেই রোগের আশঙ্কায় টিকা গ্রহণ করে, তবে এতে কোনো দোষ নেই। এটি আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা, যেমন রোগ হলে ওষুধ দিয়ে তার চিকিৎসা করা হয়। তবে রোগ, জিন বা বদনজর থেকে বাঁচার জন্য তাবিজ-কবচ ঝুলানো জায়েয নয়। কারণ নবী সা. তা নিষেধ করেছেন এবং স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, এটি শিরকে আসগর (ছোট শিরক)। অতএব, এ থেকে সতর্ক থাকা আবশ্যক।”(মাজমূউল ফাতাওয়া শাইখ ইবনু বায: ৬/২১)।
.
পরিশেষে: ইসলামী শরী‘আতের দৃষ্টিতে টিকা বা ভ্যাকসিন মূলত একটি প্রতিরোধমূলক চিকিৎসাব্যবস্থা; তাই এর বিধান নির্ভর করবে এর উপাদান, কার্যকারিতা, সম্ভাব্য ক্ষতি এবং প্রস্তুতপ্রণালীর ওপর। যেসব টিকা বৈধ ও পবিত্র উপাদানে প্রস্তুত, কার্যকারিতা পরীক্ষিত ও উপকারিতা সুস্পষ্ট—সেগুলো গ্রহণ করা বৈধ; বরং রোগ প্রতিরোধ ও জীবন সুরক্ষার উদ্দেশ্যে তা গ্রহণ করা শরী‘আতসম্মত চিকিৎসার অন্তর্ভুক্ত। আর কোনো টিকার উপাদান মূলত হারাম বা নাপাক হলেও যদি রাসায়নিক পরিবর্তনের মাধ্যমে তা সম্পূর্ণরূপে পরিবর্তিত হয়ে নতুন বৈশিষ্ট্য ও প্রকৃতির বৈধ পদার্থে পরিণত হয়, তাহলে ইস্তিহালার নীতির ভিত্তিতে তা গ্রহণ করাও বৈধ হবে। পক্ষান্তরে, যে টিকা ক্ষতিকর এবং যার উপকারিতা প্রমাণিত নয়, অথবা এর ক্ষতি উপকারের তুলনায় বেশি—তা গ্রহণ করা বৈধ নয়। একইভাবে কোনো টিকার কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য চিকিৎসাবিশেষজ্ঞদের মধ্যে এমন মতভেদ থাকে যে, কোনো মতই প্রাধান্য পায় না, তাহলে নিশ্চিত ক্ষতির আশঙ্কার কারণে তা থেকে বিরত থাকা হবে। সুতরাং টিকার ক্ষেত্রে শুধু ‘হারাম উপাদান আছে কি না’—এটুকু বিবেচনা করাই যথেষ্ট নয়; বরং উপাদানের প্রকৃতি, ইস্তিহালা সংঘটিত হয়েছে কি না, টিকার কার্যকারিতা, নিরাপত্তা ও সম্ভাব্য ক্ষতি—সবকিছু বিবেচনা করে এর বিধান নির্ধারণ করতে হবে। সর্বোপরি, চিকিৎসা ও টিকা গ্রহণকে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী মনে করা যাবে না; বরং বৈধ উপায় অবলম্বন করে উপকার গ্রহণ করা এবং অন্তরে বিশ্বাস রাখা যে, প্রকৃত আরোগ্য, উপকার ও ক্ষতি একমাত্র মহান আল্লাহরই হাতে—এটাই মুমিনের সঠিক আক্বীদা। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়, ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।

Tuesday, August 4, 2026

পুরুষ ডাক্তারের জন্য মহিলা রোগী এবং মহিলা ডাক্তারের জন্য পুরুষ রোগী পরীক্ষা ও চিকিৎসা করা কি জায়েজ

 প্রশ্ন: শরীয়তের দৃষ্টিতে পুরুষ ডাক্তারের জন্য মহিলা রোগী এবং মহিলা ডাক্তারের জন্য পুরুষ রোগী পরীক্ষা ও চিকিৎসা করা কি জায়েজ? চিকিৎসার প্রয়োজন হলে রোগীর সতরের অংশ দেখা বা স্পর্শ করার বিধান কী? কোন পরিস্থিতিতে তা বৈধ এবং এর শরয়ি শর্তাবলি কী?

▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য।শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর মূলনীতি হলো—পুরুষ ডাক্তার পুরুষ রোগীর এবং মহিলা ডাক্তার মহিলা রোগীর চিকিৎসা করবেন। অতএব, কোনো বাস্তব প্রয়োজন ও গ্রহনযোগ্য শরয়ি ওজর ছাড়া বিপরীত লিঙ্গের রোগীর চিকিৎসা করা বৈধ নয়। তবে চিকিৎসার একান্ত প্রয়োজন দেখা দিলে এবং সংশ্লিষ্ট লিঙ্গের উপযুক্ত চিকিৎসক পাওয়া না গেলে প্রয়োজনের পরিমাণ অনুযায়ী বিপরীত লিঙ্গের চিকিৎসক রোগী পরীক্ষা ও চিকিৎসা করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে প্রথমে মুসলিম মহিলা ডাক্তার না পাওয়া গেলে বিশ্বস্ত অমুসলিম মহিলা ডাক্তার দ্বারা মহিলা রোগীর চিকিৎসা করানো হবে; তাদের কেউ না পাওয়া গেলে মুসলিম পুরুষ ডাক্তার এবং একান্ত প্রয়োজন হলে অমুসলিম পুরুষ ডাক্তার চিকিৎসা করতে পারবেন। তবে চিকিৎসক রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য যতটুকু প্রয়োজন, কেবল ততটুকুই দেখবেন বা স্পর্শ করবেন; প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোনো কিছু করা বা দেখা বৈধ হবে না এবং যথাসম্ভব দৃষ্টি সংযত রাখতে হবে। একইসঙ্গে নারী রোগীর চিকিৎসার ক্ষেত্রে পুরুষ ডাক্তারের সঙ্গে রোগিনীর স্বামী, মাহরাম অথবা কোনো বিশ্বস্ত নারী উপস্থিত থাকা আবশ্যক, যাতে শরীয়তবিরোধী নির্জনতা সৃষ্টি না হয়। সুতরাং চিকিৎসার প্রকৃত প্রয়োজন, উপযুক্ত চিকিৎসকের অনুপস্থিতি, প্রয়োজনের সীমা রক্ষা এবং খালওয়াত থেকে বেঁচে থাকা—এসব শরয়ি শর্ত পূরণ সাপেক্ষেই বিপরীত লিঙ্গের ডাক্তার দ্বারা রোগী পরীক্ষা ও চিকিৎসা করা বৈধ হবে।
.
এ বিষয়ে ‘ইসলামী ফিকাহ একাডেমি’ থেকে একটি সিদ্ধান্ত প্রকাশ করা হয়েছে। তাতে রয়েছে:
” الأصل أنه إذا توافرت طبيبة متخصصة يجب أن تقوم بالكشف على المريضة ، وإذا لم يتوافر ذلك فتقوم بذلك طبيبة غير مسلمة ثقة ، فإن لم يتوافر ذلك يقوم به طبيب مسلم ، وإن لم يتوافر طبيب مسلم يمكن أن يقوم مقامه طبيب غير مسلم ، على أن يطّلع من جسم المرأة على قدر الحاجة في تشخيص المرض ومداواته وألا يزيد عن ذلك وأن يغض الطرف قدر استطاعته ، وأن تتم معالجة الطبيب للمرأة هذه بحضور محرم أو زوج أو امرأة ثقة خشية الخلوة
“শরিয়তের মূল বিধান হচ্ছে- বিশেষজ্ঞ মহিলা ডাক্তার মহিলা রোগীর চেক-আপ করবেন। যদি মুসলিম মহিলা ডাক্তার না পাওয়া যায় তাহলে বিশ্বস্ত অমুসলিম মহিলা ডাক্তার মহিলা রোগীর চেক-আপ করবেন। যদি অমুসলিম মহিলা ডাক্তারও না পাওয়া যায় তাহলে মুসলিম পুরুষ ডাক্তার মহিলা রোগীর চেক-আপ করবেন। যদি মুসলিম ডাক্তারও না পাওয়া যায় তাহলে অমুসলিম পুরুষ ডাক্তার সে দায়িত্ব পালন করবেন। তবে শর্ত হল,পুরুষ ডাক্তার রোগিনীর শরীরের ততটুকু দেখবেন যতটুকু দেখা রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার স্বার্থে প্রয়োজন; এর বেশি দেখবে না এবং সাধ্যমত দৃষ্টি অবনত রাখবে। পুরুষ ডাক্তারকে রোগিনীর চিকিৎসা করতে হবে রোগিনীর মাহরামের কিংবা স্বামী কিংবা কোন বিশ্বস্ত নারীর উপস্থিতিতে; যাতে করে নিষিদ্ধ নির্জনবাস না ঘটে।”[একাডেমীর জার্নাল থেকে সংকলিত (৮/১/৪৯)]
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] বলেছেন:الواجب أن تكون الطبيبات مختصات للنساء ، والأطباء مختصين للرجال إلا عند الضرورة القصوى إذا وجد مرض في الرجال ليس له طبيب رجل ، فهذا لا بأس به ، والله يقول : ( وقد فصل لكم ما حرم عليكم إلا ما اضطررتم إليه ) “ওয়াজিব হলো নারীদের চিকিৎসার জন্য নারী চিকিৎসক এবং পুরুষদের চিকিৎসার জন্য পুরুষ চিকিৎসক নির্দিষ্ট থাকা।তবে চরম জরুরতের ক্ষেত্রে,যদি কোনো পুরুষের এমন কোনো রোগ দেখা দেয় যার জন্য কোনো পুরুষ চিকিৎসক না পাওয়া যায়, তাহলে নারী চিকিৎসক চিকিৎসা করতে পারেন। আল্লাহ তাআলা বলেছেন:অথচ যা তোমাদের জন্য তিনি হারাম করেছেন তা তিনি বিশদভাবেই তোমাদের কাছে বিবৃত করেছেন,তবে তোমরা নিরুপায় হলে তা স্বতন্ত্র।”(সূরা আন‘আম: ১১৯; ফাতাওয়া আজিলাহ লিমানসুবিস সিহ্হাহ: ২৯)
.
◾কোন কোন পরিস্থিতিতে একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের জন্য বিপরীত লিঙ্গের রোগীকে চিকিৎসা করা শরিয়তসম্মত?
.
আমরা প্রথমেই উল্লেখ করেছি যে, চিকিৎসার ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো—সম্ভব হলে নারী রোগীর চিকিৎসা নারী চিকিৎসকের মাধ্যমে এবং পুরুষ রোগীর চিকিৎসা পুরুষ চিকিৎসকের মাধ্যমে করানোই অধিক উত্তম ও অগ্রাধিকারযোগ্য। কারণ চিকিৎসার প্রয়োজনে রোগীর শরীরের বিভিন্ন অংশ দেখা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা এবং প্রয়োজনে শরীরের কোনো অংশ স্পর্শ করার দরকার হতে পারে। ফলে একই লিঙ্গের চিকিৎসক পাওয়া গেলে তার মাধ্যমেই চিকিৎসা গ্রহণ করা অধিক নিরাপদ এবং শরিয়তের পর্দা ও শালীনতার বিধান পালনের জন্যও অধিক উপযোগী।তবে বাস্তবতা ও চিকিৎসাগত প্রয়োজনের কারণে সব সময় একই লিঙ্গের দক্ষ চিকিৎসক পাওয়া সম্ভব হয় না। কোনো নির্দিষ্ট রোগ বা চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিশেষ শাখায় বিপরীত লিঙ্গের চিকিৎসকই যদি অধিক দক্ষ ও অভিজ্ঞ হন, একই লিঙ্গের চিকিৎসক না থাকেন, অথবা থাকলেও তার পর্যাপ্ত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা না থাকে—তাহলে প্রয়োজনের সীমার মধ্যে বিপরীত লিঙ্গের অভিজ্ঞ চিকিৎসকের মাধ্যমে চিকিৎসা গ্রহণ করা বৈধ।তবে এই বৈধতা প্রয়োজনের পরিমাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। চিকিৎসক ও রোগী উভয়কেই শরিয়তের পর্দা, শালীনতা, নির্জনতা এবং প্রয়োজনের সীমা-সংক্রান্ত বিধান যথাযথভাবে মেনে চলতে হবে। এ ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখা জরুরি:
.
(১).চিকিৎসক ও রোগী নির্জনে অবস্থান করবে না: পুরুষ চিকিৎসক কোনো নারী রোগীর সঙ্গে এবং নারী চিকিৎসক কোনো পুরুষ রোগীর সঙ্গে এমন নির্জন স্থানে একাকী অবস্থান করবেন না, যেখানে তাদের সঙ্গে তৃতীয় কোনো ব্যক্তি নেই। সম্ভব হলে রোগীর স্বামী/স্ত্রী, বাবা-মা, ভাই-বোন, মাহরাম অথবা অন্য কোনো বিশ্বস্ত ব্যক্তি উপস্থিত থাকা উচিত। একইভাবে হাসপাতাল বা ক্লিনিকের এমন কোনো স্টাফের উপস্থিতিতেও নির্জনতা দূর হয়ে যায়, যার উপস্থিতিতে চিকিৎসা কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব। কারণ, গায়রে মাহরাম নারী-পুরুষের নির্জনে অবস্থান করা শরিয়তসম্মত নয় এবং এ বিষয়ে ফকীহদের সর্বসম্মত ইজমা রয়েছে। উভয়ে বৃদ্ধ হোক কিংবা একজন বৃদ্ধ ও অন্যজন তরুণ হোক—এ বিধানের কোনো পরিবর্তন হয় না। আল-মাওসু‘আতুল ফিকহিয়্যাহ-তে বলা হয়েছে: «ولفظ الرجل في الحديث يتناول الشيخ والشاب، كما أن لفظ المرأة يتناول الشابة والمتجالة (العجوز)»—“হাদীসে ‘পুরুষ’ শব্দটি যেমন যুবক ও বৃদ্ধ উভয়কেই অন্তর্ভুক্ত করে, তেমনি ‘নারী’ শব্দটিও যুবতী ও বৃদ্ধা উভয়কেই অন্তর্ভুক্ত করে।” (আল-মাওসু‘আতুল ফিকহিয়্যাহ, ২৯/২৯৫)। এ বিষয়ে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: «لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا كَانَ ثالثهما الشَّيْطَان»—“কোনো পুরুষ কোনো নারীর সঙ্গে নির্জনে অবস্থান করলে শয়তান তাদের তৃতীয়জন হয়।” (তিরমিযী, হা/১১৭১)। অপরদিকে ইবনু ‘আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, নবী (ﷺ) বলেছেন: «لا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ وَلا تُسَافِرَنَّ امْرَأَةٌ إِلا وَمَعَهَا مَحْرَمٌ»—“কোনো পুরুষ যেন কোনো নারীর সঙ্গে নির্জনে অবস্থান না করে এবং কোনো নারী যেন মাহরাম ছাড়া সফর না করে।” (সহীহ বুখারী, হা/৩০০৬; সহীহ মুসলিম, হা/১৩৪১)। তাই চিকিৎসার প্রয়োজনে চিকিৎসক ও রোগীর একান্ত নির্জনতা এড়িয়ে চলা আবশ্যক। পাশাপাশি চিকিৎসককে বিশ্বস্ত, সচ্চরিত্র ও দ্বীনদার হওয়া উচিত; তার চরিত্র ও আমানতদারির ব্যাপারে কোনো সন্দেহ বা বদনাম থাকা উচিত নয়। এক্ষেত্রে মানুষের বাহ্যিক অবস্থাকে সঠিক ও গ্রহণযোগ্য হিসেবে ধরে নেওয়াই যথেষ্ট।
.
ইমাম ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:وَأَمَّا إِذَا خَلَا الْأَجْنَبِيّ بِالْأَجْنَبِيَّةِ مِنْ غَيْر ثَالِث مَعَهُمَا، فَهُوَ حَرَام بِاتِّفَاقِ الْعُلَمَاء , وَكَذَا لَوْ كَانَ مَعَهُمَا مَنْ لَا يُسْتَحَى مِنْهُ لِصِغَرِهِ كَابْنِ سَنَتَيْنِ وَثَلَاث وَنَحْو ذَلِكَ , فَإِنَّ وُجُوده كَالْعَدَمِ , وَكَذَا لَوْ اِجْتَمَعَ رِجَال بِامْرَأَةٍ أَجْنَبِيَّة فَهُوَ حَرَام , بِخِلَافِ مَا لَوْ اِجْتَمَعَ رَجُل بِنِسْوَةٍ أَجَانِب , فَإِنَّ الصَّحِيح جَوَازه “যখন কোনো গায়রে মাহরাম পুরুষ ও গায়রে মাহরাম নারী তৃতীয় কোনো ব্যক্তি ছাড়া নির্জনে একত্রিত হয়, তখন তা সকল আলেমের ঐকমত্য অনুযায়ী হারাম। অনুরূপভাবে, যদি তাদের সঙ্গে এমন ছোট শিশু থাকে, যার উপস্থিতিকে লজ্জার কারণ মনে করা হয় না—যেমন দুই বা তিন বছরের শিশু তাহলেও তার উপস্থিতি না থাকারই শামিল। আবার, একাধিক পুরুষ যদি একজন গায়রে মাহরাম নারীর সঙ্গে নির্জনে থাকে, তাও হারাম। তবে একজন পুরুষ যদি একাধিক গায়রে মাহরাম নারীর সঙ্গে থাকে, তাহলে বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী তা বৈধ।”(নববী শারহু সহীহ মুসলিম; খণ্ড: ১৪; পৃষ্ঠা: ১৫৩)
.
(২).চিকিৎসার প্রয়োজন যতটুকু,ততটুকুই দেখা যাবে এর অতিরিক্ত নয়:রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসার জন্য রোগীর শরীরের যে অংশ দেখা অপরিহার্য, শুধু প্রয়োজনের পরিমাণ অনুযায়ী সেই অংশটুকুই দেখা যাবে। এর অতিরিক্ত কোনো অংশ দেখা কোনো ভাবেই বৈধ নয়। চিকিৎসকের উচিত আল্লাহকে ভয় করা এবং সর্বদা মনে রাখা—আল্লাহ তাআলা মানুষের প্রকাশ্য ও গোপন সবকিছু অবগত আছেন এবং প্রত্যেক কাজের হিসাব গ্রহণ করবেন।মহান আল্লাহ বলেছেন:إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا “নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের উপর তীক্ষ্ম দৃষ্টি রাখেন।” (সূরা নিসা:১) অপর আয়াতে আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:﴿فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ﴾“অতএব, তোমরা সাধ্যানুযায়ী আল্লাহকে ভয় করো।”—সূরা আত-তাগাবুন, ৬৪:১৬) এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, শরিয়তের বিধান পালনে সামর্থ্য ও প্রয়োজনের সীমা বিবেচনা করা হয়। চিকিৎসার ক্ষেত্রে যে অংশ দেখা অপরিহার্য, শুধু ততটুকুই দেখা হবে; অপ্রয়োজনীয় অংশ দেখা যাবে না।রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,لَا يَنْظُرُ الرَّجُلُ إِلَى عَوْرَةِ الرَّجُلِ، وَلَا الْمَرْأَةُ إِلَى عَوْرَةِ الْمَرْأَةِ، وَلَا يُفْضِي الرَّجُلُ إِلَى الرَّجُلِ فِي ثَوْبٍ وَاحِدٍ، وَلَا تُفْضِي الْمَرْأَةُ إِلَى الْمَرْأَةِ فِي الثَّوْبِ الْوَاحِدِ ‘কোনো পুরুষ যেন অপর পুরুষের এবং কোনো নারী যেন অপর নারীর ‘আওরাত’ না দেখে। আর কোনো পুরুষ যেন অপর পুরুষের সাথে এক কাপড়ের নিচে না থাকে। অনুরূপ কোনো নারীও যেন অপর নারীর সাথে এক কাপড়ের নিচে না থাকে”(সহীহ মুসলিম, হা/৩৩৮)
.
হাদিসটির আলোকে ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,فَفِيهِ تَحْرِيمٌ نَظَرُ الرَّجُلِ إِلَى عَوْرَةِ الرَّجُلِ وَالْمَرْأَةُ إِلَى عَوْرَةِ الْمَرْأَةِ وَهَذَا لَا خِلَافَ فِيهِ وَكَذَلِكَ نَظَرُ الرَّجُلِ إِلَى عَوْرَةِ الْمَرْأَةِ وَالْمَرْأَةُ إِلَى عَوْرَةِ الرَّجُلِ حَرَامٌ بِالْإِجْمَاعِ وَنَبَّهَ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِنَظَرِ الرَّجُلِ إِلَى عَوْرَةِ الرَّجُلِ عَلَى نَظَرِهِ إِلَى عَوْرَةِ الْمَرْأَةِ وَذَلِكَ بِالتَّحْرِيمِ أَوْلَى ‘এ হাদীছে একজন পুরুষের অন্য পুরুষের গোপনাঙ্গের দিকে এবং একজন মহিলার অন্য মহিলার গোপনাঙ্গের দিকে তাকানো হারাম হওয়ার প্রমাণ আছে। আর এ ব্যাপারে কোনো দ্বিমত নেই। একইভাবে, কোনো পুরুষের জন্য কোনো মহিলার গোপনাঙ্গের দিকে এবং কোনো মহিলার জন্য কোনো পুরুষের গোপনাঙ্গের দিকে তাকানো ইজমার ভিত্তিতে হারাম। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন পুরুষকে অন্য পুরুষের গোপনাঙ্গের দিকে তাকানোর ব্যাপারে সতর্ক করার মাধ্যমে একজন পুরুষের জন্য একজন মহিলার গোপনাঙ্গের দিকে তাকানোর ব্যাপারে সাবধান করেছেন। বরং এটা আরো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে হারাম”(আল-মিনহাজ শারহু সহীহি মুসলিম ইবনিল হাজ্জাজ,৪/৩০) এছাড়াও সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম এর হাদিসে। আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:«فَزِنَا العَيْنِ النَّظَر»“চোখের যিনা দৃষ্টিপাত।”(সহিহ বুখারি হা/৬২৪৩; ও সহিহ মুসলিম হা/২৬৫৭) ইবনে বাত্তাল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: “দৃষ্টি ও কথাকে যিনা বলা হয়েছে যেহেতু এগুলো প্রকৃত যিনার আহ্বায়ক। এজন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “যৌনাঙ্গ সেটাকে বাস্তবায়ন করে অথবা করে না।” ফাতহুল বারি হতে সংকলিত। ইবনুল আরাবী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, وَكَمَا لَا يَحِلُّ لِلرَّجُلِ أَنْ يَنْظُرَ إلَى الْمَرْأَةِ فَكَذَلِكَ لَا يَحِلُّ لِلْمَرْأَةِ أَنْ تَنْظُرَ إلَى الرَّجُلِ، فَإِنَّ عَلَاقَتَهُ بِهَا كَعَلَاقَتِهَا بِهِ، وَقَصْدُهُ مِنْهَا كَقَصْدِهَا مِنْهُ. ‘একজন পুরুষের জন্য যেমন একজন নারীর দিকে তাকানো বৈধ নয়, তেমনি একজন নারীর জন্যও একজন পুরুষের দিকে তাকানো বৈধ নয়। কারণ নারীর সাথে পুরুষের সম্পর্ক যেমন, পুরুষের সাথে নারীর সম্পর্কও তেমন। নারীর কাছ থেকে পুরুষের চাওয়াপাওয়া যা, পুরুষের কাছ থেকে নারীর চাওয়াপাওয়াও তা”।(ইবনুল আরাবী, আহকামুল কুরআন, ৩/৩৮০)
.
(৩).চিকিৎসার প্রয়োজন ছাড়া শরীর স্পর্শ করা যাবে না:চিকিৎসার জন্য রোগীর শরীরের যে অংশ স্পর্শ করা অপরিহার্য, কেবল সেই অংশটুকুই প্রয়োজনের সীমায় স্পর্শ করা যাবে। অপ্রয়োজনীয় কোনো স্পর্শ বৈধ নয়। আর যদি হাতমোজা, কাপড় বা অন্য কোনো উপযুক্ত আবরণ ব্যবহার করে পরীক্ষা বা চিকিৎসা সম্পন্ন করা সম্ভব হয়, তাহলে সরাসরি স্পর্শের পরিবর্তে আবরণ ব্যবহার করাই অপরিহার্য কর্তব্য।মা’ক্বিল বিন য়্যাসার বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:”لأن يطعن في رأس رجل بمخيط من حديد خير من أن يمس امرأة لا تحل له “কোন ব্যক্তির মাথায় লৌহ সূচ দ্বারা খোঁচা মারা ভাল, তবুও যে নারী তার জন্য অবৈধ তাকে স্পর্শ করা ভাল নয়”(সিলসিলা সহীহাহ হা/২২৬; সহীহুত তারগীব হা/১৯১০)।হাদিসটির আলোকে ইমাম আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:في الحديث : وعيد شديد لمن مس امرأة لا تحل له “হাদিসে ওই ব্যক্তির জন্য কঠোর শাস্তির হুমকি রয়েছে, যে এমন নারীকে স্পর্শ করে যে তার জন্য হালাল নয়।”(সিলসিলাহ সহীহা (১/৪৪৮) থেকে সমাপ্ত।
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণ বলেছেন:ليس المراد بالخلوة المحرمة شرعاً انفراد الرجل بامرأة أجنبية منه في بيت بعيداً عن أعين الناس فقط ، بل تشمل انفراده بها في مكان تناجيه ويناجيها ، وتدور بينهما الأحاديث ، ولو على مرأى من الناس دون سماع حديثهما ، سواء كان ذلك في فضاء أم سيارة أو سطح بيت أو نحو ذلك ؛ لأن الخلوة منعت لكونها بريد الزنا وذريعة إليه [ أي : مقدمة الزنا ووسيلة إليه ] ، فكل ما وجد فيه هذا المعنى فهو في حكم الخلوة الحسية بعيدا عن أعين الناس”শরিয়তে নিষিদ্ধ খালওয়াত বলতে শুধু এমন নয় যে কোনো পুরুষ ও গায়রে মাহরাম নারী মানুষের দৃষ্টির বাইরে কোনো ঘরে একান্তে থাকবে। বরং এমন যেকোনো অবস্থাও খালওয়াতের অন্তর্ভুক্ত, যেখানে তারা একান্তে কথা বলতে পারে, পরস্পরের সঙ্গে গোপনে আলাপ করতে পারে যদিও মানুষ তাদের দেখতে পায়, কিন্তু তাদের কথা শুনতে না পায়। তা খোলা মাঠে হোক, গাড়িতে, ছাদে বা অন্য যেকোনো স্থানে। কারণ খালওয়াত নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যেহেতু এটি ব্যভিচারের দিকে নিয়ে যাওয়ার একটি মাধ্যম ও ভূমিকা। তাই যেখানে এই অর্থ বিদ্যমান, সেখানেই তা শরিয়তের দৃষ্টিতে খালওয়াতের হুকুমের অন্তর্ভুক্ত।”(ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; গ্রুপ: ২; খণ্ড: ১৭; পৃষ্ঠা: ৫৭)
.
(৪).কথাবার্তা চিকিৎসার প্রয়োজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে হবে:চিকিৎসক ও বিপরীত লিঙ্গের রোগীর মধ্যে কথাবার্তা রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা এবং চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট প্রয়োজনীয় বিষয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। অপ্রয়োজনীয় আলাপচারিতা, হাসি-ঠাট্টা, ব্যক্তিগত আলোচনা কিংবা এমন কোনো কথাবার্তা থেকে বিরত থাকতে হবে, যা শালীনতার সীমা লঙ্ঘন করে অথবা ফিতনার আশঙ্কা সৃষ্টি করে।মহান আল্লাহ বলেন,یٰنِسَآءَ النَّبِیِّ لَسۡتُنَّ کَاَحَدٍ مِّنَ النِّسَآءِ اِنِ اتَّقَیۡتُنَّ فَلَا تَخۡضَعۡنَ بِالۡقَوۡلِ فَیَطۡمَعَ الَّذِیۡ فِیۡ قَلۡبِهٖ مَرَضٌ وَّ قُلۡنَ قَوۡلًا مَّعۡرُوۡفًا হে নবী-পত্নিগণ, তোমরা অন্য নারীদের মত নও; যদি তোমরা আল্লাহ্‌কে ভয় কর তবে পর-পুরুষের সাথে কোমল কণ্ঠে এমনভাবে কথা বলো না, যাতে অন্তরে যার ব্যাধি আছে সে প্রলুব্ধ হয়। আর তোমরা সদালাপ কর। স্বাভাবিকভাবে কথা বল। (সূরা আহযাব; ৩৩/৩২) মহান আল্লাহ তাআলা যেরূপভাবে নারী জাতির দেহ-বৈচিত্রে পুরুষের জন্য যৌন আকর্ষণ সৃষ্টি করেছেন (যা থেকে হেফাযতের বিশেষ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে নারী পুরুষের জন্য ফেতনার কারণ না হয়ে পড়ে।) অনুরূপভাবে তিনি নারীদের কণ্ঠস্বরেও প্রকৃতিগতভাবে মন কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা, কোমলতা ও মধুরতা রেখেছেন, যা পুরুষকে নিজের দিকে আকর্ষণ করতে থাকে। সুতরাং সেই কণ্ঠস্বর ব্যবহার করার ব্যাপারেও এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, পর-পুরুষের সাথে বাক্যালাপের সময় ইচ্ছাপূর্বক এমন কণ্ঠ ব্যবহার করবে, যাতে কোমলতা ও মধুরতার পরিবর্তে সামান্য শক্ত ও কঠোরতা থাকে। যাতে ব্যাধিগ্রস্ত অন্তরবিশিষ্ট লোক কণ্ঠের কোমলতার কারণে তোমাদের দিকে আকৃষ্ট না হয়ে পড়ে এবং তাদের মনে কুবাসনার সঞ্চার না হয়। (অত্র আয়াতের তাফসির) তাছাড়া নারীরা বাসায় সালাত আদায়ের সময় আশেপাশে গায়ের মাহরাম পুরুষ থাকলে উচ্চস্বরে পড়া সালাতের কির’আত নীরবে পাঠ করার কথা বলা হয়েছে। (নববী আল-মাজমূ; খন্ড: ৩; পৃষ্ঠা:;১০০; বিন বায,;ফাতাওয়া নূরুন আলাদ-দারব: ৯/৩৫)।
.
আল মাওযূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ আল-কুয়েতিয়াহ, কুয়েতি ফিক্বহ বিশ্বকোষে বলা হয়েছে, إنْ كَانَ صَوْتَ امْرَأَةٍ ، فَإِنْ كَانَ السَّامِعُ يَتَلَذَّذُ بِهِ ، أَوْ خَافَ عَلَى نَفْسِهِ فِتْنَةً حَرُمَ عَلَيْهِ اسْتِمَاعُهُ ، وَإِلاَّ فَلاَ يَحْرُمُ ، وَيُحْمَل اسْتِمَاعُ الصَّحَابَةِ رِضْوَانُ اللَّهِ عَلَيْهِمْ أَصْوَاتَ النِّسَاءِ حِينَ مُحَادَثَتِهِنَّ عَلَى هَذَا ، وَلَيْسَ لِلْمَرْأَةِ تَرْخِيمُ الصَّوْتِ وَتَنْغِيمُهُ وَتَلْيِينُهُ ، لِمَا فِيهِ مِنْ إثَارَةِ الْفِتْنَةِ ، وَذَلِكَ لِقَوْلِهِ تَعَالَى : فَلاَ تَخْضَعْنَ بِالْقَوْل فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ নারীর কণ্ঠস্বরে যদি শ্রোতা আনন্দ পায় বা প্রলুব্ধ হওয়ার আশংকা করে, তবে তা শোনা তার জন্য হারাম। অন্যথায় তা হারাম নয়। এমন বর্ণনা এসেছে যে ,মহিলারা যখন কথা বলতো তখন সাহাবীরা তাদের কথা শুনতেন। এই বর্ননাগুলোকে বোঝাতে হবে সেসব ক্ষেত্রে উল্লেখ করে, যেখানে ফিতনার ভয় ছিল না। একজন মহিলার তার কণ্ঠস্বর নরম এবং লোভনীয় করা উচিত নয়, কারণ এটি ফিতনার কারণ। যেমন মহান আল্লাহ বলেছেন;…সুতরাং পর-পুরুষের সাথে কোমল কণ্ঠে এমনভাবে কথা বলো না,যাতে অন্তরে যার ব্যাধি আছে সে প্রলুব্ধ হয়। আর তোমরা সদালাপ কর। স্বাভাবিকভাবে কথা বল। (সূরা আহযাব; ৩৩/৩২, আল মাওযূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ আল-কুয়েতিয়াহ,খন্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৯০)
.
(৫).চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রয়োজনকে অজুহাত বানানো যাবে না: বিপরীত লিঙ্গের চিকিৎসকের মাধ্যমে চিকিৎসার অনুমতি পাওয়া মানে এই নয় যে, চিকিৎসার অজুহাতে পর্দার বিধান শিথিল করা যাবে কিংবা প্রয়োজনের অতিরিক্ত শরীর দেখা, স্পর্শ করা বা অবাধ কথাবার্তা বলা যাবে। বরং চিকিৎসার ক্ষেত্রে যতটুকু প্রয়োজন, শরিয়ত ততটুকুই অনুমতি দিয়েছে; প্রয়োজন শেষ হলে অনুমতির সীমাও শেষ হয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলা বলেন: ﴿وَقَدْ فَصَّلَ لَكُم مَّا حَرَّمَ عَلَيْكُمْ إِلَّا مَا اضْطُرِرْتُمْ إِلَيْهِ﴾ “তিনি তোমাদের জন্য যা কিছু হারাম করেছেন, তা বিস্তারিতভাবে বলে দিয়েছেন; তবে তোমরা যার প্রতি বাধ্য হও, তা ব্যতীত।” (সূরা আল-আন‘আম: ১১৯)। আয়াতের «إِلَّا مَا اضْطُرِرْتُمْ إِلَيْهِ»—“তোমরা যার প্রতি বাধ্য হও”—এই অংশটি প্রমাণ করে যে, জরুরি অবস্থায় নিষিদ্ধ বিষয়ের যতটুকু অনুমতি দেওয়া হয়, তা কেবল প্রয়োজনের সীমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আলেমগণের নিকট স্বতঃসিদ্ধ শরয়ি নীতি হলো—ইসলাম কল্যাণ সাধন ও তা পূর্ণতা দান এবং অকল্যাণ প্রতিহত বা হ্রাস করার জন্য এসেছে। তাই বড় অকল্যাণ দূর করার জন্য তুলনামূলক ছোট অকল্যাণে লিপ্ত হওয়া প্রয়োজনের ক্ষেত্রে বৈধ হতে পারে। সুতরাং জরুরি অবস্থা নিষিদ্ধ বিষয়কে প্রয়োজনের পরিমাণ অনুযায়ী সাময়িকভাবে বৈধ করে। চিকিৎসার তীব্র প্রয়োজনের সময় রোগীর অসুস্থ স্থান দেখা, প্রয়োজন অনুযায়ী শরীরের অংশবিশেষ উন্মুক্ত করা বা স্পর্শ করার বৈধতার ব্যাপারে আলেমগণের মধ্যে কোনো দ্বিমত নেই—যেমন জরুরী ক্ষেত্রে নারী রোগীর চিকিৎসায় পুরুষ চিকিৎসক এবং পুরুষ রোগীর চিকিৎসায় নারী চিকিৎসকের ক্ষেত্রেও একই বিধান প্রযোজ্য। কারণ, এখানে সতর ও পর্দা রক্ষার স্বার্থের সঙ্গে জীবন রক্ষা ও চিকিৎসার প্রয়োজনের সংঘাত হলে বৃহত্তর কল্যাণ তথা জীবন ও স্বাস্থ্যের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। তবে “জরুরত তার মাত্রা অনুযায়ী নির্ধারিত হয়”—এই গুরুত্বপূর্ণ নীতির কারণে চিকিৎসার অনুমতিকে কখনোই সীমালঙ্ঘনের অজুহাত বানানো যাবে না। অতএব, যতটুকু দেখা, উন্মুক্ত করা, স্পর্শ করা বা কথা বলা চিকিৎসার জন্য অপরিহার্য, কেবল ততটুকুই বৈধ হবে; প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোনো কিছু করা শরয়ি বিধানের সীমালঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে।
.
◾বিপরীত লিঙ্গের রোগীর চিকিৎসা ও চিকিৎসকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শরয়ী বিধান সম্পর্কে সালাফী আলেমগণের ফতোয়াসমূহ নিম্নে তুলে ধরা হলো:
.
শাফেয়ী মাযহাবের আলেম শামসুদ্দীন খতীব শিরবিনী (রাহিমাহুল্লাহ) পুরুষের নারীর প্রতি দৃষ্টির বিধান আলোচনা করতে গিয়ে বলেন:النظر للمداواة كحجامة وعلاج ، ولو في فرج ، فيجوز إلى المواضع التي يحتاج إليها فقط ؛ لأن في التحريم حينئذ حرجاً ، فللرجل مداواة المرأة ، وعكسه ، وليكن ذلك بحضرة محرم ، أو زوج ، أو امرأة ثقة ، ويشترط عدم امرأة يمكنها تعاطي ذلك ، وأن لا يكون ذميا مع وجود مسلم ، ولو لم نجد لعلاج المرأة إلا كافرة ومسلما: فالظاهر أن الكافرة تقدم لأن نظرها ومسها أخف من الرجل…. وقيد في ” الكافي ” الطبيب بالأمين ، فلا يعدل إلى غيره مع وجوده ، وشرط الماوردي أن يأمن الافتتان ولا يكشف إلا قدر الحاجة “চিকিৎসার উদ্দেশ্যে যেমন শিঙ্গা লাগানো বা অন্যান্য চিকিৎসা প্রয়োজন হলে, এমনকি লজ্জাস্থানও দেখতে হলে, কেবল যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু দেখা বৈধ। কারণ, এ অবস্থায় নিষিদ্ধ করলে মানুষের জন্য কষ্ট সৃষ্টি হবে। সুতরাং পুরুষ চিকিৎসক নারীর চিকিৎসা করতে পারে, তেমনি নারী চিকিৎসকও পুরুষের চিকিৎসা করতে পারে। তবে এ সময় রোগিণীর সঙ্গে তার মাহরাম, স্বামী অথবা কোনো বিশ্বস্ত নারী উপস্থিত থাকতে হবে। আরও শর্ত হলো, এ চিকিৎসা করতে সক্ষম কোনো নারী চিকিৎসক থাকবে না। আর মুসলিম চিকিৎসক থাকলে অমুসলিম চিকিৎসকের কাছে যাওয়া যাবে না। তবে যদি নারীর চিকিৎসার জন্য কেবল একজন কাফির নারী চিকিৎসক এবং একজন মুসলিম পুরুষ চিকিৎসক পাওয়া যায়, তাহলে বাহ্যিকভাবে কাফির নারী চিকিৎসককেই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। কারণ, তার দেখা ও স্পর্শ পুরুষের তুলনায় হালকা। আল কাফী গ্রন্থে চিকিৎসককে বিশ্বস্ত হওয়ার শর্তও উল্লেখ করা হয়েছে। আর ইমাম মাওয়ারদী শর্ত করেছেন যে, ফিতনার আশঙ্কা না থাকতে হবে এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত শরীর উন্মুক্ত করা যাবে না। (আল ইকনা; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৬৯)
.
একই আলেম মুগনী আল মুহতাজ গ্রন্থে জরুরি প্রয়োজনে কারা নারীর গোপন অঙ্গ দেখতে পারে এ বিষয়ে ইমাম বুলকীনীর ক্রমবিন্যাস উল্লেখ করেছেন:
১. প্রথমে একজন মুসলিম নারী।
২. তিনি না থাকলে অপ্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম বালক।
৩. সেও না থাকলে অপ্রাপ্তবয়স্ক অমুসলিম বালক।
৪. তাও না থাকলে একজন অমুসলিম নারী।
৫. তারপর মুসলিম মাহরাম।
৬. তিনি না থাকলে অমুসলিম মাহরাম।
৭. এরপর মুসলিম গায়রে মাহরাম পুরুষ।
৮. সবশেষে অমুসলিম গায়রে মাহরাম পুরুষ। (মুগনী আল মুহতাজ ৪/২১৬)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: চিকিৎসার প্রয়োজনে পুরুষের সামনে নারীর আওরাত বা নারীর সামনে পুরুষের আওরাত খোলা কি বৈধ? আর যদি কেবল একজন খ্রিস্টান নারী চিকিৎসক এবং একজন মুসলিম পুরুষ চিকিৎসক থাকেন, তাহলে কার কাছে চিকিৎসা নেওয়া উচিত?
উত্তরে শাইখ রাহিমাহুল্লাহ বলেন:
كشف عورة الرجل للمرأة ، والمرأة للرجل عند الحاجة لذلك حال العلاج : لا بأس به بشرطين :
الشرط الأول : أن تؤمن الفتنة .
الشرط الثاني : أن لا يكون هناك خلوة .
والطبيبة النصرانية المأمونة أولى في علاج المرأة من الرجل المسلم ؛ لأنها من جنسها بخلاف الرجل .
والله المسئول أن يصلح أحوال المسلمين “
“চিকিৎসার প্রয়োজনে পুরুষের সামনে নারীর আওরাত অথবা নারীর সামনে পুরুষের আওরাত খোলা বৈধ, তবে দুটি শর্তে:
প্রথম শর্ত: ফিতনার আশঙ্কা থেকে নিরাপদ থাকা।
দ্বিতীয় শর্ত: নির্জন অবস্থায় না হওয়া।
আর বিশ্বস্ত খ্রিস্টান নারী চিকিৎসক নারীর চিকিৎসার ক্ষেত্রে মুসলিম পুরুষ চিকিৎসকের তুলনায় অধিক অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত; কারণ তিনি নারীরই সমগোত্রীয় (অর্থাৎ একই লিঙ্গের), পক্ষান্তরে পুরুষ ভিন্ন লিঙ্গের।আল্লাহর নিকট প্রার্থনা, তিনি যেন মুসলিমদের অবস্থা সংশোধন করে দেন।”(ইবনু উসাইমীন, মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল, খণ্ড: ১২; পৃষ্ঠা: ১৭৫)।
.
শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)-কে আরও জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: রোগ নির্ণয়ের জন্য কোনো নারীর সতরের অংশ পরীক্ষা করা কি বৈধ? আর চিকিৎসা শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য রোগিণীর সতর দেখানো কি বৈধ? তিনি উত্তরে বলেন: “كشف المرأة ‌ما ‌يجب ‌عليها ‌ستره ‌من ‌أجل ‌مصلحة ‌الطب ‌ببيان ‌ما ‌فيها من مرض وتشخيصه هذا لا بأس به ، لأنه لحاجة ، والحاجة تبيح مثل هذا المحرم ، إذ القاعدة المعروفة عند أهل العلم : أن ما حرم تحريم الوسائل أباحته الحاجة ، وما حرم تحريماً ذاتياً تحريم المقاصد فإنه لا يبيحه إلا الضرورة ، وذكروا لذلك أمثلة وهي النظر إلى ما لا يجوز النظر إليه من المرأة للحاجة ، كما يجوز نظر الخاطب إلى ما لا يجوز النظر إليه من أجل مصلحة النكاح”চিকিৎসার স্বার্থে রোগ নির্ণয় ও রোগের অবস্থা বোঝার জন্য নারীর যে অংশ সাধারণত আবৃত রাখা ফরজ, তা প্রয়োজনবশত উন্মুক্ত করা বৈধ। কারণ এটি প্রয়োজনের অন্তর্ভুক্ত। শরিয়তের একটি সুপরিচিত নীতি হলো যেসব বিষয় উপায়গত কারণে হারাম, প্রয়োজন হলে তা বৈধ হয়ে যায়। আর যেসব বিষয় নিজগতভাবে হারাম, সেগুলো কেবল চরম প্রয়োজন ছাড়া বৈধ হয় না। এর উদাহরণ হলো প্রয়োজনের কারণে নারীর এমন অঙ্গ দেখা, যা সাধারণ অবস্থায় দেখা বৈধ নয়। যেমন, বিবাহের উদ্দেশ্যে পাত্রের জন্য কনেকে দেখা বৈধ, তেমনি চিকিৎসকের জন্য রোগ নির্ণয়ের স্বার্থে নারীর প্রয়োজনীয় অঙ্গ পরীক্ষা করাও বৈধ।”(ইবনু উসাইমীন, ফাতাওয়া নূরুন ‘আলাদ দারব: ৯/২)
.
অপর ফাতাওয়ায় মুহাম্মাদ ইবনে সালিহ আল উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: একই বিষয়ে একজন নারী চিকিৎসক থাকা সত্ত্বেও কোনো নারীর পুরুষ চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা নেওয়ার বিধান কী?
তিনি উত্তরে বলেন: “إذا كان الاختصاص واحداً والحذق (المهارة) متساوياً بين الرجل والمرأة فإن المرأة لا تذهب إلى الرجل ، لأنه لا داعي لذلك ولا حاجة ، أما إذا كان الرجل أحذق من المرأة ، أو كان اختصاصه أعمق فلا حرج عليها أن تذهب إليه ، وإن كان هناك امرأة ؛ لأن هذه حاجة ، والحاجة تبيح مثل هذا “যদি পুরুষ ও নারী চিকিৎসকের বিশেষজ্ঞতা একই হয় এবং দক্ষতাও সমান হয়, তাহলে নারীর পুরুষ চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত নয়। কারণ এর কোনো প্রয়োজন বা জরুরি কারণ নেই। কিন্তু যদি পুরুষ চিকিৎসক নারী চিকিৎসকের তুলনায় অধিক দক্ষ হন, অথবা তাঁর বিশেষজ্ঞতা আরও গভীর হয়, তাহলে নারী চিকিৎসক থাকা সত্ত্বেও তাঁর কাছে চিকিৎসা নেওয়ায় কোনো অসুবিধা নেই। কারণ এটি একটি প্রয়োজন, আর প্রয়োজন এমন বিষয়কে বৈধ করে। (ফাতাওয়া উলামা আলা বালাদিল হারাম পৃষ্ঠা: ৬৯৩)
.
ইমাম ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)-কে আরও জিজ্ঞেস করা হয় যে, “আমরা একদল ডাক্তার রিয়াদে চাকুরী করি। আমাদের ডিউটিকালে পুরুষ ও মহিলা রোগী আসে। কখনো কখনো কোন মহিলা রোগী মাথা ব্যথা বা পেটে ব্যথার কথা বলেন। পরিপূর্ণ চিকিৎসার দাবী হচ্ছে- রোগিনীকে পরীক্ষা করে দেখা। পরীক্ষার মাধ্যমে মাথা ব্যথার কারণ নির্ণয় করা। রোগের কারণ নির্ণয় করতে গেলে রোগীর পেট কিংবা মাথা কিংবা অন্য কোন অঙ্গ পরীক্ষা করার প্রয়োজন হয়; যাতে করে ডাক্তারের উপর কোন দায় না আসে। আর যদি রোগিনীকে পরীক্ষা করা না হয় হতে পারে এতে করে রোগিনী ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। অর্থাৎ এক্ষেত্রে পরীক্ষা না করারও সুযোগ আছে। তবে যথাযথ কনসালটেন্সির করতে গেলে পরীক্ষা করা প্রয়োজন…।
শাইখ জবাবে বলেন:الواجب على إدارة المستشفى أن تلاحظ هذا وأن تجعل المناوبة بين الرجال والنساء حتى إذا احتاج النساء المرضى أن يُعالجن أو يفحصن أُرسل إليهن النساء ، فإذا لم تقم الإدارة بهذا الواجب عليها ولم تبال فأنتم لا حرج أن تفحصوا النساء ، لكن بشرط ألا يكون هناك خلوة أو شهوة ، وأيضا يكون هناك حاجة إلى الفحص ، فإن لم يكن حاجة وأمكن تأخير الفحص الدقيق إلى وقت تحضر فيه النساء فأخروه ، وإذا كان لا يمكن فهذه حاجة ولا بأس بها ” হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কর্তব্য হচ্ছে- পুরুষ ডাক্তার ও মহিলা ডাক্তারের মাঝে এমনভাবে ডিউটি ভাগ করে দেয়া যাতে করে মহিলা রোগী আসলে তাদের চেক-আপ করা ও পরীক্ষা করার জন্য মহিলা ডাক্তারের কাছে পাঠানো যায়। যদি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ কর্তব্য পালন না করে, এ বিষয়ে ভ্রূক্ষেপ না করে তাহলে মহিলাদের চিকিৎসা করায় আপনারা গুনাহগার হবেন না। তবে শর্ত হচ্ছে- চিকিৎসাকালে কোন মহিলা রোগীর সাথে নির্জনবাস না ঘটা এবং যৌন উত্তেজনা না আসা এবং প্রকৃতপক্ষে রোগীকে পরীক্ষা করার প্রয়োজন থাকা। যদি পরীক্ষা করার প্রয়োজন না থাকে, কিংবা সূক্ষ্ম পরীক্ষা পরবর্তীতে মহিলা ডাক্তার আসার পর করলেও চলে তাহলে সে পরীক্ষা পরবর্তীতেই করতে হবে। আর যদি দেরী করার সুযোগ না থাকে; তাহলে এটি প্রয়োজন। এমতাবস্থায় পুরুষ ডাক্তার মহিলা রোগীর চিকিৎসা করলে গুনাহ হবে না।”[ইবনু উসাইমীন; লিকাআতুল বাব আল-মাফতুহ: ১/২০৬)]
.
পরিশেষে বলা যায়, চিকিৎসার মূলনীতি হলো—পুরুষের চিকিৎসা পুরুষ চিকিৎসক এবং নারীর চিকিৎসা নারী চিকিৎসকের মাধ্যমে করা। তবে বাস্তব প্রয়োজন বা উপযুক্ত চিকিৎসকের অনুপস্থিতিতে শরয়ি শর্তসাপেক্ষে বিপরীত লিঙ্গের চিকিৎসকের মাধ্যমে চিকিৎসা বৈধ। এক্ষেত্রে প্রয়োজনের পরিমাণ অনুযায়ী সতর দেখা বা স্পর্শ করা, খালওয়াত ও ফিতনা থেকে বেঁচে থাকা এবং অপ্রয়োজনীয় দৃষ্টি, স্পর্শ ও কথাবার্তা পরিহার করা আবশ্যক। অতএব, চিকিৎসার প্রয়োজনকে শরিয়তের সীমালঙ্ঘনের অজুহাত না বানিয়ে প্রয়োজনের সীমা যথাযথভাবে রক্ষা করাই শরিয়তের নির্দেশনা। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়,ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।

কুকুরের লালা কারও শরীর পোশাক বা পাত্রে লাগলে তা পবিত্র করার শরয়ি পদ্ধতি কী

 প্রশ্ন: কুকুর কি সত্তাগতভাবে নাপাক, নাকি কেবল তার লালাই নাপাক? কুকুরের লালা কারও শরীর, পোশাক বা পাত্রে লাগলে তা পবিত্র করার শরয়ি পদ্ধতি কী?

▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য।শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর কুকুর সত্তাগতভাবে নাপাক কি না—এ বিষয়ে আহলুল ইলমের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এ বিষয়ে তিনটি মত রয়েছে:
◽প্রথম মত: কুকুর সত্তাগতভাবেই নাপাক। শুধু তার লালাই নয়; বরং তার সবকিছু তার দেহ, এমনকি পশমও নাপাক। এটি শাফেয়ী মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত এবং ইমাম আহমদ (রহিমাহুল্লাহ)-এর বর্ণিত দুই মতের একটি। সৌদি আরবের ফতোয়া বিষয়ক স্থায়ী কমিটির নির্বাচিত মতও এটি। এই মতের আলেমগন দলিল হিসেবে উল্লেখ করেছেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস:(طُهُورُ إِنَاءِ أحَدِكُمْ إِذَا وَلَغَ فِيهِ الكَلْبُ أنْ يَغْسِلَهُ سَبْعَ مَرَّاتٍ أُولاَهُنَّ بِالتُّرَابِ)“তোমাদের কারো পাত্রে যদি কুকুর মুখ দেয় (চেটে খায়), তবে এর পবিত্রতা হল: সাতবার ধোয়া; প্রথমবার মাটি দিয়ে।”[হাদীসটি মুসলিম হা/২৭৯) বর্ণনা করেছেন]
.
শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন:ففيه دلالة ظاهرة لمذهب الشافعي وغيره رضي الله عنه ممن يقول بنجاسة الكلب لأن الطهارة تكون عن حدث أو نجس وليس هنا حدث فتعين النجس .فإن قيل: المراد الطهارة اللغوية ؟فالجواب: أن حمل اللفظ على حقيقته الشرعية مقدم على اللغوية“এ হাদীসে ইমাম শাফেয়ী (রাহিমাহুল্লাহ) এবং তাঁর সঙ্গে একমত অন্যান্য আলেমদের মতের সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে, যারা কুকুরকে নাপাক বলেন। কারণ ‘পবিত্রতা’ (طهارة) হয় অপবিত্রতা (হাদাস) অথবা নাজাসাত (নাপাক বস্তু) থেকে। এখানে হাদাসের কোনো বিষয় নেই, তাই অবশ্যই তা নাজাসাতের কারণেই। যদি বলা হয়, এখানে ‘পবিত্রতা’ বলতে ভাষাগত অর্থ বোঝানো হয়েছে, তবে তার জবাব হলো—শরীয়তের পরিভাষাগত অর্থকে ভাষাগত অর্থের ওপর অগ্রাধিকার দিতে হবে।”—(শারহু সহীহ মুসলিম (৩/১৮৪)। আরও দেখুন: ফাতহুল বারী (১/২৭৬)
.
শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, আবুল ফাদল আহমাদ বিন আলি ইবনু হাজার আল-আসকালানি,(রাহিমাহুল্লাহ) [জন্ম:৭৭৩ হি: মৃত:৮৫২ হি:] বলেছেন:والتعليل بالتنجيس أقوى، لأنه في معنى المنصوص، وقد ثبت عن ابن عباس التصريح بأن الغسل من ولوغ الكلب بأنه رجس رواه محمد بن نصر المروزي بإسناد صحيح ، ولم يصح عن أحد من الصحابة خلافه “কুকুরকে নাপাক বলার কারণ-ভিত্তিক ব্যাখ্যাই অধিক শক্তিশালী। কারণ এটি হাদীসের বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ইবন আব্বাস (রাযি.) থেকে সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি কুকুরের মুখ দেওয়া পাত্র ধোয়ার কারণ সম্পর্কে স্পষ্টভাবে বলেছেন: ‘এটি অপবিত্র (رجس)।’ আর এ বিষয়ে কোনো সাহাবী থেকে এর বিপরীত মত সহীহভাবে বর্ণিত হয়নি।”(ফাতহুল বারী (১/২৭৭) খাত্তাবী (রাহিমাহুল্লাহ) হাদিসটির ব্যাখ্যায় বলেন: في هذا الحديث من الفقه أن الكلب نجس الذات ، ولولا نجاسته لم يكن لأمره بتطهير الإناء من ولوغه معنى ، والطهور يقع في الأصل إما لرفع حدث أو لإزالة نجس ، والإناء لا يلحقه حكم الحدث ، فعُلم أنه قصد به إزالة النجس .وإذا ثبت أن لسانه الذي يتناول به الماء نجس يجب تطهير الإناء منه ، عُلم أن سائر أجزائة وأبعاضه في النجاسة بمثابة لسانه ، فبأي جزء من أجزاء بدنه ماسه وجب تطهيره“এ হাদীসে যে ফিকহী বিধান রয়েছে তাহলো: কুকুর সত্তাগতভাবে নাপাক। যদি সে নাপাক না হতো তবে কুকুরের মুখ দেওয়ার কারণে পাত্রকে ধোয়ার আদেশ করার কোনো অর্থ থাকে না। মূলতঃ পবিত্র করা হয় অপবিত্র অবস্থা (হাদাস) দূর করার জন্য অথবা নাপাকি (নাজাস) দূর করার জন্য। আর পাত্রের ক্ষেত্রে হাদাস (অপবিত্র অবস্থা) প্রযোজ্য নয়। অতএব বোঝা গেল, ধোয়ার নির্দেশ করা দ্বারা উদ্দেশ্য ছিল নাপাকি (নাজাস) দূর করা। যেহেতু প্রমাণিত হলো যে, তার জিহ্বা (যা দিয়ে সে পানি খায়) নাপাক এবং তা থেকে পাত্রকে পবিত্র করা জরুরী, সেহেতু এটাও বোঝা গেল যে, কুকুরের দেহের অন্যান্য অংশও নাপাক হওয়ার ক্ষেত্রে কুকুরের জিহ্বার মতোই। অতএব কুকুরের দেহের যে অংশই কোনো কিছুকে স্পর্শ করবে সেটাকেই ধৌত করা ও পবিত্র করা ওয়াজিব।”(মা‘আলিমুস সুনান; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৩৯)
.
হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ, শাইখুল ইসলাম, ইমাম ‘আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] বলেছেন:فالنجس نوعان: أحدهما: ما هو نجس، رواية واحدة، وهو الكلب، والخنزير، وما تولد منهما، أو من أحدهما، فهذا نجس، عينه، وسؤره، وجميع ما خرج منه، روي ذلك عن عروة، وهو مذهب الشافعي، وأبي عبيد، وهو قول أبي حنيفة في السؤر خاصة “নাপাক বস্তু দুই প্রকার। প্রথম প্রকার হলো—যা সর্বসম্মতিক্রমে (এক বর্ণনা অনুযায়ী) নাপাক। তা হলো: কুকুর, শূকর এবং এ দুটির উভয় থেকে অথবা এদের যেকোনো একটির থেকে জন্ম নেওয়া প্রাণী। এগুলোর সত্তা, উচ্ছিষ্ট এবং এগুলো থেকে নির্গত সবকিছুই নাপাক। এ মতটি উরওয়াহ (রাহি.) থেকে বর্ণিত। এটিই ইমাম শাফেয়ী, আবূ উবাইদ-এর মাযহাব। আর ইমাম আবূ হানীফার মতে অন্তত কুকুরের উচ্ছিষ্টের ক্ষেত্রে এ মত গ্রহণযোগ্য।”(আল-মুগনী; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৬৪)
.
ফতোয়া বিষয়ক স্থায়ী কমিটির আলেমগন বলেন:الكلب نجس كله روثه وعرقه ولعابه، ويجب غسل ما لوثه من إناء وغيره بالماء حتى يطهر، أما اللعاب خاصة؛ فيجب غسل ما أصابه سبع مرات بالماء، إحداهن بالتراب، أو ما يقوم مقامه من المنظفات كالصابون وغيره؛ لقول النبي صلى الله عليه وسلم: طهور إناء أحدكم إذا ولغ فيه الكلب أن يغسله سبع مرات أولاهن بالتراب خرجه مسلم في (صحيحه)“কুকুর সম্পূর্ণই নাপাক। তার মল, ঘাম ও লালা—সবই নাপাক। যে পাত্র বা অন্য কোনো বস্তু কুকুর নাপাক করেছে, তা পানি দিয়ে ধুয়ে পবিত্র করতে হবে। তবে বিশেষভাবে লালার ক্ষেত্রে সাতবার ধোয়া আবশ্যক। এর একটি ধোয়া মাটি দিয়ে বা মাটির বিকল্প কোনো পরিষ্কারকারী পদার্থ, যেমন সাবান ইত্যাদি দিয়ে হতে হবে। কারণ রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: ‘তোমাদের কারো পাত্রে কুকুর মুখ দিলে, তার পবিত্রতা হলো সেটিকে সাতবার ধোয়া; প্রথমবার মাটি দিয়ে।’” — ফাতাওয়া আল-লাজনাহ আদ-দায়িমাহ (৪/১৯৭)
.
◽দ্বিতীয় মত: কুকুর সত্তাগতভাবে পবিত্র। এমনকি তার লালাও সাধারণভাবে পবিত্র; তাই তা নাপাক বলে গণ্য হবে না। এটি মালেকি মাযহাবের মত।ইমাম মালিক (রহিমাহুল্লাহ)-এর প্রসিদ্ধ মত হলো: “কুকুরের লালা নাপাক নয়। তবে যে পাত্রে কুকুর মুখ দেয়, সেটি সাতবার ধোয়া হবে—এটি কেবল ইবাদতস্বরূপ (তাআব্বুদী বিধান)।” ইবনু আবদুল বার (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: واختلف الفقهاء أيضا في سؤر الكلب وما ولغ فيه من الماء والطعام .فجملة ما ذهب إليه مالك واستقر عليه مذهبه عند أصحابه: أن سؤر الكلب طاهر، ويغسل الإناء من ولوغه سبعا ؛ تعبدا “ফকীহগণ কুকুরের উচ্ছিষ্ট এবং কুকুর মুখ দেওয়া পানি ও খাদ্য সম্পর্কে মতভেদ করেছেন। ইমাম মালিকের যে মতের ওপর তাঁর অনুসারীরা স্থির হয়েছেন, তা হলো—কুকুরের উচ্ছিষ্ট পবিত্র। তবে কুকুর মুখ দিলে পাত্র সাতবার ধুতে হবে, ইবাদতস্বরূপ।”—আত-তামহীদ: ১৮/২৬৯) কুকুরের লালা পবিত্র—এই মতকে ইমাম ইবনুল মুনযির ও ইমাম বুখারী (রহিমাহুমাল্লাহ) সমর্থন করেছেন। তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী দলিল:আল্লাহ তাআলা শিকারি কুকুর যে শিকার ধরে আনে তা খাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন, কিন্তু সেই শিকার ধুয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেননি। আল্লাহ তাআলা বলেন:﴿فَكُلُوا مِمَّا أَمْسَكْنَ عَلَيْكُمْ وَاذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَيْهِ﴾ “অতএব শিকারি কুকুর তোমাদের জন্য যা ধরে রাখে, তা থেকে খাও এবং তাতে আল্লাহর নাম উচ্চারণ কর।”—(সূরা আল-মায়িদাহ: ৪)
.
ইবনু রুশদ (রহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:فذهب مالك في الأمر بإراقة سؤر الكلب وغسل الإناء منه، إلى أن ذلك عبادة غير معللة، وأن الماء الذي يلغ فيه ليس بنجس، ولم ير إراقة ما عدا الماء من الأشياء التي يلغ فيها الكلب في المشهور عنه، وذلك كما قلنا لمعارضة ذلك القياس له .ولأنه ظن أيضا أنه إن فهم منه أن الكلب نجس العين عارضه ظاهر الكتاب، وهو قوله تعالى: ( فَكُلُوا مِمَّا أَمْسَكْنَ عَلَيْكُمْ ) : يريد أنه لو كان نجس العين ، لنجس الصيد بمماسته “ইমাম মালিক কুকুরের উচ্ছিষ্ট ফেলে দেওয়া এবং পাত্র ধোয়ার নির্দেশকে এমন একটি ইবাদত হিসেবে গ্রহণ করেছেন, যার কোনো নির্দিষ্ট কারণ (ইল্লত) বর্ণিত হয়নি। তাই তাঁর মতে কুকুর মুখ দেওয়া পানি নাপাক নয়। প্রসিদ্ধ মতে, কুকুর মুখ দেওয়া অন্যান্য খাদ্যও ফেলে দিতে হবে—এ কথাও তিনি বলেননি। কারণ কিয়াস এ মতের বিরোধিতা করে। আর তাঁর ধারণা ছিল, যদি এ হাদীস থেকে কুকুরের সত্তা নাপাক হওয়া বোঝা যায়, তবে তা কুরআনের ظاهر (বাহ্যিক অর্থ)-এর বিরোধী হবে। কেননা আল্লাহ বলেন: ﴿فَكُلُوا مِمَّا أَمْسَكْنَ عَلَيْكُمْ﴾ অর্থাৎ, যদি কুকুরের সত্তাই নাপাক হতো, তবে তার স্পর্শে শিকারও নাপাক হয়ে যেত।”(বিদায়াতুল মুজতাহিদ (১/৮৩–৮৪)
.
◽তৃতীয় মত: কুকুরের দেহ ও পশম পবিত্র; তবে তার লালা নাপাক। এটি ইমাম আবু হানীফা (রহিমাহুল্লাহ)-এর মাযহাব এবং ইমাম আহমদ (রহিমাহুল্লাহ)-এর বর্ণিত দুই মতের অপর একটি। বহু মুহাক্কিক আলেমের মতে, এ মতটিই অধিক বিশুদ্ধ ও প্রাধান্যযোগ্য। এই মতের পক্ষে ও আলেমগন দলিল হিসেবে একই হাদিস উল্লেখ করেছেন। যেখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “তোমাদের কারো পাত্রে যদি কুকুর মুখ দেয় (চেটে খায়), তবে এর পবিত্রতা হল: সাতবার ধোয়া; প্রথমবার মাটি দিয়ে।”[হাদীসটি মুসলিম (২৭৯) বর্ণনা করেছেন]
.
উপরোক্ত হাদীসের আলোকে কিছু আলেম বলেছেন:أن الحديث يدل على نجاسة لعابه وريقه وفمه فقط ، وأما بقية بدنه فيبقى على الأصل وهو الطهارة ، وهو مذهب الحنفية ، واختاره شيخ الإسلام ابن تيمية . ينظر: “এ হাদীস কেবল তার লালা, থুতু ও মুখ নাপাক হওয়ার প্রমাণ করে। আর কুকুরের শরীরের বাকি অংশ মূল বিধানের উপর বলবৎ থাকবে। আর তা হলো পবিত্র হওয়া। এটি হানাফী মাযহাবের মত। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া এ মতটি গ্রহণ করেছেন।[দেখুন: মাজমূউল ফাতাওয়া: (২১/৫৩০)] ইবনে দাকিকিল ঈদ রাহিমাহুল্লাহ স্পষ্ট করে বলেছেন:بأن الحكم على جميع بدن الكلب بالنجاسة أنه اجتهاد من العلماء وليس نصًّا عن النبي صلى الله عليه وسلم فقال : ” فتبين بهذا أن الحديث إنما دل على النجاسة فيما يتعلق بالفم ، وأن نجاسة بقية البدن بطريق الاستنباط”কুকুরের পুরো দেহকে নাপাক বলা আলেমদের ইজতিহাদ; রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সরাসরি বক্তব্য নয়।তিনি বলেন: “এতে স্পষ্ট হলো যে, হাদীসটি কেবল মুখের সাথে সম্পৃক্ত কিছু নাপাক হওয়া প্রমাণ করে। আর দেহের বাকি অংশ নাপাক হওয়া দলিল থেকে উদ্ভাবিত (ইস্তিনবাতকৃত)।”[ইহকামুল আহকাম: (পৃ. ২৪) থেকে সমাপ্ত]
.
প্রিয় পাঠক! উপরোক্ত তিনটি মতের মধ্যে অধিক শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য মত হলো—কুকুর সত্তাগতভাবে পবিত্র; তবে তার লালা অপবিত্র (নাজিস)। এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সহীহ হাদীস সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেছে, আর আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণাও কুকুরের লালায় ক্ষতিকর জীবাণুর উপস্থিতির বিষয়টি সমর্থন করে। তাই কোনো কুকুর যদি কোনো পাত্রে মুখ দেয় বা তা থেকে পান করে, এরপর সেই পাত্র ব্যবহার করতে চাইলে প্রথমে পাত্রের ভেতরের পানি ফেলে দিতে হবে। অতঃপর পাত্রটি সাতবার পানি দিয়ে ধুতে হবে, যার একবার হবে মাটি দিয়ে ভালোভাবে ঘষে। তবে পাত্রটি যদি কুকুরের নিজস্ব ব্যবহারের জন্যই নির্ধারিত থাকে, তাহলে তা ধোয়া আবশ্যক নয়। পাত্র পবিত্র করার ক্ষেত্রে মাটি ব্যবহার করাই শরীয়তের নির্দেশ; মাটি সহজলভ্য থাকলে অন্য কোনো বস্তু তার বিকল্প হতে পারে না। তবে যদি মাটি পাওয়া একেবারেই সম্ভব না হয়, তাহলে প্রয়োজনের কারণে সাবান বা অন্য কোনো পরিচ্ছন্নকারী পদার্থ ব্যবহার করা যেতে পারে।অন্যদিকে, যেহেতু কুকুর সত্তাগতভাবে নাপাক নয়, তাই শুধু কুকুর স্পর্শ করা বা কুকুরের শরীরের স্পর্শ কাপড় বা শরীরে লাগার কারণে-বিশেষ করে কুকুরের শরীর শুষ্ক থাকলে এবং তার গায়ে কোনো বাহ্যিক নাপাকি না থাকলে-শরীর বা কাপড়কে বিশেষ কোনো পদ্ধতিতে, যেমন মাটি বা সাতবার পানি দিয়ে ধোয়ার প্রয়োজন নেই। তবে কুকুরের লালা শরীর, কাপড় বা পাত্রে লাগলে শরীয়তে বর্ণিত বিধান অনুযায়ী তা পবিত্র করতে হবে,আর শুধু স্পর্শের কারণে অতিরিক্ত কঠোরতা বা অযথা সন্দেহে পতিত হওয়া উচিত নয়।
.
কুকুর সংক্রান্ত বিষয়ে আলেমদের মতভেদ করে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ বলেন:وأما الكلب فقد تنازع العلماء فيه على ثلاثة أقوال: أحدها: أنَّه طاهرٌ حتى ريقه، وهذا هو مذهب مالك. والثانـي: نجس حتى شعره، وهذا هو مذهب الشافعي، وإحدى الروايتين عن أحمد. والثالث: شعره طاهـر، وريقه نجسٌ، وهذا هو مذهب أبي حنيفة وأحمد في إحدى الروايتين عنه. وهذا أصحُّ الأقوال، فإذا أصاب الثوبَ أو البدنَ رطوبةُ شعره لم ينجس بذلك”কুকুরের ব্যাপারে আলেমরা তিনটি মতে বিভক্ত। প্রথম মত হচ্ছে: কুকুর পবিত্র; এমনকি কুকুরের লালাও। এটি মালেকের মাযহাব। দ্বিতীয় মত হচ্ছে: এটি অপবিত্র; এমনকি পশমও। এটি শাফেয়ীর মাযহাব এবং ইমাম আহমদের বর্ণনাদ্বয়ের একটি। তৃতীয় মত হচ্ছে: এর পশম পবিত্র; লালা অপবিত্র। এটি ইমাম আবু হানীফা ও আহমাদের অন্য বর্ণনা। এই মতটি বিশুদ্ধতম। তাই যদি কোনো পোশাকে বা কাপড়ে কুকুরের পশমের সিক্ততা স্পর্শ করে তাতে সেটি অপবিত্র হয়ে যায় না।’[মাজমুউল ফাতাওয়া (২১/৫৩০)]
.
অন্য স্থানে শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়ার (রাহিমাহুল্লাহ) আরও বলেন: “কেননা বস্তুর মূল অবস্থা হচ্ছে পবিত্রতা। সুতরাং কোনো দলীল ছাড়া কোনো কিছুকে অপবিত্র বা হারাম বলা জায়েয নেই। কেননা আল্লাহ তা’আলা বলেন:وَقَدْ فَصَّلَ لَكُمْ مَا حَرَّمَ عَلَيْكُمْ إِلاَّ مَا اضْطُّرِرْتُم إِلَيْهِ“আল্লাহ তোমাদের জন্য যা যা হারাম করেছেন বিস্তারিতভাবে সেগুলোর বিবরণ দিয়েছেন; অবশ্য নিরুপায় হয়ে তোমরা কিছু খেতে বাধ্য হলে তার কথা আলাদা।”[সূরা আন’আম: ১১৯] তিনি আরো বলেন:وَمَا كَانَ اللهُ لِيُضِلَّ قَوْماً بَعْدَ إِذْ هَدَاهُم حَتَّى يُبَيِّنَ لَهُم مَا يَتَّقُونَ“কোনো সম্প্রদায়কে পথ দেখানোর পর তারা কি কি পরিহার করবে তা স্পষ্টভাবে বলে না দেওয়া পর্যন্ত আল্লাহ তাদেরকে বিপথগামী করেন না। আল্লাহ সবকিছু ভালোভাবে জানেন।”[সূরা তাওবাহ: ১১৫] বিষয়টি যেহেতু এমন তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “কুকুর কোন পাত্রে পান করলে সেই পাত্রকে পবিত্র করতে হলে সেটাকে সাতবার ধৌত করতে হবে। এর মধ্যে প্রথমবার মাটি দিয়ে (মাজতে হবে)।” অন্য হাদীসে বলেছেন: “যদি কুকুর পান করে…” এ সংক্রান্ত সমস্ত হাদীসে কেবল ولوغ (জিহ্বা দিয়ে পান করা)-এর কথা বলা হয়েছে; বাকি কোনো অঙ্গের কথা উল্লেখ করা হয়নি। সুতরাং অন্যান্য অঙ্গকে নাপাক বলার ভিত্তি হচ্ছে কিয়াস।অধিকন্তু, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিকারের কুকুর এবং গবাদিপশু ও শস্যক্ষেত পাহারার কুকুর প্রতিপালনে ছাড় দিয়েছেন। যে ব্যক্তি এ ধরণের কুকুর পালে নিঃসন্দেহে তার শরীরে কুকুরের পশমের সিক্ততা লেগে যায়; যেমনিভাবে খচ্চর, গাধা বা অন্যান্য প্রাণীর সিক্ততা লাগে। তাই কুকুরের পশম নাপাক বলার মত এমন সংকীর্ণ পরিস্থিতি থেকে এ উম্মাহকে মুক্ত রাখা হয়েছে।’[মাজমুউল ফাতাওয়া (২১/২১৭, ২১৯)]
.
◾কুকুর স্পর্শ করা বা তার লালা ওযু ভঙ্গ করে? আর কুকুরের লালা কাপড়ে বা শরীরে লাগলে পবিত্রতা অর্জনের উপায় কি?
.
কুকুর স্পর্শ করা বা তার লালা ওযু ভঙ্গ করে না। কারণ ওযু বা পবিত্রতা যখন শরয়ী দলিলের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, তখন তা কেবল শরয়ী দলিল দ্বারাই বাতিল হতে পারে। আর কুকুর স্পর্শ করা বা তার লালা লাগার কারণে ওযু ভঙ্গের সপক্ষে কোনো দলিল নেই; তাই আলেমরা ওযু ভঙ্গের কারণগুলোর মধ্যে এটি উল্লেখ করেননি। ইবন কুদামা আল-মুগনীতে ওযু ভঙ্গের কারণগুলো উল্লেখ করার পর (যেখানে তিনি কুকুর স্পর্শ করা বা তার লালা লাগার কথা উল্লেখ করেননি) বলেন: “এগুলোই পবিত্রতা ভঙ্গের সমস্ত কারণ এবং সাধারণ আলেমদের মতে এর বাইরে অন্য কিছু দ্বারা তা ভঙ্গ হয় না।” (ইবন কুদামা আল-মুগনী (১/২৬৪)
.
তবে এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, কুকুরের লালা নাপাক ও অপবিত্র। শুধু তাই নয়, এর নাপাকি অত্যন্ত কঠোর ও তীব্র। তাই কুকুরের লালা শরীর, পোশাক বা কোনো পাত্রে লাগলে সাধারণভাবে ধুয়ে ফেলাই যথেষ্ট নয়; বরং শরীয়ত নির্ধারিত পদ্ধতিতে তা সাতবার ধৌত করা আবশ্যক, যার একটি ধৌত মাটি দিয়ে হতে হবে। বর্তমান যুগে মাটির পরিবর্তে মাটির উপাদানসমৃদ্ধ বা মাটির সমতুল্য পরিষ্কারকারী দ্রব্য ব্যবহারেরও অবকাশ রয়েছে বলে একদল আলেম মত প্রকাশ করেছেন। অতএব, কুকুরের লালা লাগা স্থানটি শরয়ি বিধান অনুযায়ী সাতবার ভালোভাবে ধুয়ে পবিত্র করতে হবে, যার একটি ধৌত অবশ্যই মাটি বা তার শরয়ি বিকল্প দ্বারা সম্পন্ন হবে।
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: “বড় বড় কিছু প্রতিষ্ঠানের চেকপোস্টে প্রশিক্ষিত কুকুর ব্যবহার করা হয়। কুকুর গাড়ির ভেতরে ঢুকে শুঁকে দেখে এবং কখনো চেটে দেয়। এতে কি গাড়ির সিট বা যেসব জায়গা কুকুর শুঁকেছে বা চেটেছে, সেগুলো নাপাক হয়ে যাবে?”
তিনি উত্তরে বলেন:أما الشم فإنه لا يضر؛ لأنه لا يخرج من الكلب ريق، وأما اللحس فيخرج فيه من الكلب ريق، وإذا أصاب ريق الكلب ثياباً أو شبهها : فإنها تغسل سبع مرات، ولا نقول: إحداها بالتراب؛ لأنه ربما يضر، لكن نقول: يستعمل عن التراب صابوناً أو شبهه من المزيل ويكفي مع الغسلات السبع“শুধু শোঁকার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা নেই; কারণ শোঁকার সময় কুকুরের মুখ থেকে লালা বের হয় না। কিন্তু চাটার ক্ষেত্রে কুকুরের লালা বের হয়। সুতরাং কুকুরের লালা যদি কোনো কাপড় বা এ জাতীয় বস্তুর ওপর লাগে, তাহলে তা সাতবার ধুতে হবে। তবে আমরা বলি না যে, সাতবারের একবার অবশ্যই মাটি দিয়ে ধুতে হবে; কারণ এতে (উক্ত বস্তুটির) ক্ষতি হতে পারে। বরং মাটির পরিবর্তে সাবান বা অনুরূপ কোনো পরিষ্কারকারী পদার্থ ব্যবহার করা হবে। আর সাতবার ধুয়ে নিলেই যথেষ্ট।”(ইবনু উসামীন লিক্বাউল বাব আল-মাফতূহ, লিক্বা নং-৪৯/৮)
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: “কুকুরের লালা যদি মানুষের শরীরে বা কাপড়ে লাগে, তবে তার বিধান কী? আর সেই কাপড় যদি অন্য কাপড়ের সঙ্গে একই ওয়াশিং মেশিনে, একই পানিতে ধোয়া হয়, তবে সেই কাপড়গুলোর হুকুম কী?” তারা উত্তরে বলেন: لعاب الكلب نجس ، يجب غسل ما أصابه من إناء أو ثوب لقوله صلى الله عليه وسلم : (طَهُورُ إِنَاءِ أَحَدِكُمْ إِذَا وَلَغَ فِيهِ الْكَلْبُ أَنْ يَغْسِلَهُ سَبْعَ مَرَّاتٍ أُولَاهُنَّ بِالتُّرَابِ) .والثياب إذا ألقيت في الماء الطهور وغسلت حتى زال أثر النجاسة عنها طهرت جميعا من نجاسة الكلب وغيره ، بشرط أن يتكرر غسلها من نجاسة الكلب سبع مرات ، تكون أولاهن بالتراب أو ما يقوم مقامه كالصابون والأشنان“কুকুরের লালা নাপাক। যে পাত্র বা কাপড়ে তা লাগে, তা ধোয়া আবশ্যক। কেননা রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: ‘তোমাদের কারো পাত্রে কুকুর মুখ দিলে, তার পবিত্র করার পদ্ধতি হলো—তা সাতবার ধোয়া; যার প্রথমবারটি মাটি দিয়ে।”(সহীহ মুসলিম) আর কাপড় যদি পবিত্র পানিতে ধোয়া হয় এবং এমনভাবে ধোয়া হয় যে, তা থেকে নাপাকির সমস্ত চিহ্ন দূর হয়ে যায়, তাহলে তা কুকুরের নাপাকি এবং অন্যান্য সব নাপাকি থেকেই পবিত্র হয়ে যাবে। তবে শর্ত হলো, কুকুরের নাপাকির ক্ষেত্রে কাপড়টি সাতবার ধোয়া হবে; যার প্রথমবারটি মাটি দিয়ে অথবা মাটির বিকল্প কোনো পরিষ্কারকারী বস্তু—যেমন সাবান বা উশনান (পরিষ্কারক উদ্ভিদ)—দিয়ে হবে।”(ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; গ্রুপ: ২; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ১৯৬)
.
পরিশেষে উপরোক্ত আলোচনা থেকে একথা পরিস্কার যে, কুকুর সত্তাগতভাবে নাপাক কি না—এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে তিনটি প্রসিদ্ধ মত রয়েছে: (১) কুকুর সম্পূর্ণরূপে নাপাক, (২) কুকুর ও তার লালা উভয়ই পবিত্র, এবং (৩) কুকুরের দেহ ও পশম পবিত্র; তবে তার লালা নাপাক। দলিল-প্রমাণের গভীর পর্যালোচনায় বহু মুহাক্কিক আলেম—যেমন শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যা (রাহিমাহুল্লাহ)—তৃতীয় মতটিকেই অধিক শক্তিশালী ও প্রাধান্যযোগ্য বলে গ্রহণ করেছেন। এ মতানুযায়ী, কুকুরের শরীর বা পশম স্পর্শ করলে—বিশেষত তা শুষ্ক অবস্থায় হলে—মানুষের শরীর বা পোশাক নাপাক হয় না। তবে কুকুরের লালা শরীর, পোশাক বা কোনো পাত্রে লাগলে, শরীয়ত নির্দেশিত পদ্ধতিতে তা সাতবার ধৌত করতে হবে; যার একবার হবে মাটি দ্বারা (অথবা প্রয়োজনে মাটির সমতুল্য পরিচ্ছন্নকারী কোনো বস্তু দ্বারা)। এছাড়া কুকুর স্পর্শ করা বা তার লালা লাগার কারণে ওযু ভঙ্গ হয় না। অতএব, এ বিষয়ে অযথা কঠোরতা, বাড়াবাড়ি বা অমূলক সন্দেহে না পড়ে, সহীহ সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী কেবল কুকুরের লালার নাপাকির বিধান যথাযথভাবে পালন করাই একজন মুসলিমের কর্তব্য।(আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

কোনো ব্যক্তিকে মানুষের সামনে মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করা কি অন্যায়

 প্রশ্ন: কোনো ব্যক্তিকে মানুষের সামনে মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করা কি অন্যায়? এটা কি তাকে অপমান করা, লজ্জিত করা বা তার দোষ প্রকাশ করার অন্তর্ভুক্ত? নাকি তাকে একান্তে নিষেধ করা ও উপদেশ দেওয়া জরুরি?

▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
প্রথমত: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য।শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর উপদেশ হচ্ছে মুসলিম ভ্রাতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ একটি আলামত। এটি পূর্ণ ঈমান ও পরিপূর্ণ ইহসান শ্রেণীর গুণ। কারণ কোন মুসলিম ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ ঈমানদার হতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না সে নিজের জন্য যা ভালবাসে তার মুসলিম ভাই-এর জন্যেও তা ভালবাসে। এবং যতক্ষণ পর্যন্ত না সে নিজের জন্য যা অপছন্দ করে তার মুসলিম ভাই-এর জন্যেও তা অপছন্দ করে। আর এটাই হচ্ছে- উপদেশ দেয়ার প্রেরণা। সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিম -এ জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে যে, তিনি বলেন: “আমি রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতে এই মর্মে বাইয়াত করলাম যে, নামায আদায় করব, যাকাত প্রদান করব এবং প্রত্যেক মুসলিমের কল্যাণ কামনা করব।”(বুখারী হা/৫৭ ও সহিহ মুসলিম হা/৫৬) এবং সহিহ মুসলিমে তামিম আদ-দারি (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “দ্বীন হচ্ছে- নাসীহা (উপদেশ, কল্যাণ কামনা)। আমরা বললাম: কার জন্য? তিনি বললেন: আল্লাহ্‌র জন্য, তাঁর কিতাবের জন্য, তাঁর রাসূলের জন্য, মুসলিম নেতৃবর্গের জন্য এবং সাধারণ মুসলমানদের জন্য।”(মুসলিম হা/৫৫) হাদিসের ব্যাখায় ইবনুল আছির (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: সাধারণ মুসলমানদের জন্য নসীহত হচ্ছে- তাদেরকে নিজেদের কল্যাণের দিক-নির্দেশনা দেয়া।[আন-নিহায়া (৫/১৪২) থেকে সমাপ্ত]
.
দ্বিতীয়ত: ইসলামের মৌলিক নীতি হলো—কোনো মুসলিমের ভুল সংশোধনের উদ্দেশ্যে তাকে গোপনে একান্তে, আন্তরিকতা ও প্রজ্ঞার সঙ্গে নসিহত করাই সুন্নাহসম্মত এবং অধিক কল্যাণকর পদ্ধতি। তাই শরীয়তসম্মত কোনো সুস্পষ্ট ও বৃহত্তর স্বার্থ বা প্রয়োজন ব্যতীত জনসমক্ষে কাউকে নসিহত বা ভর্ত্সনা করা উচিত নয়। কেননা, প্রকাশ্যে নসিহত অনেক সময় ব্যক্তির সম্মানহানি ও বিব্রতবোধের কারণ হয়, ফলে সে উপদেশ গ্রহণের পরিবর্তে আত্মসম্মানে আঘাত পেয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। তাই সাধারণ অবস্থায় ব্যক্তির মর্যাদা রক্ষা করে নির্জনে নসিহত করাই ইসলামের শিক্ষা এবং নসিহতের উদ্দেশ্য সফল হওয়ার জন্য এটিই সর্বাধিক হিকমতপূর্ণ ও ফলপ্রসূ পন্থা।
.
শাইখুল ইসলাম নাসিরুল হাদীস ফাক্বীহুল মিল্লাত ইমাম মুহাম্মাদ বিন ইদরীস আশ-শাফি‘ঈ আল-মাক্কী (রাহিমাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৫০ হি: মৃত: ২০৪ হি.]-এর দিওয়ানে তথা কবিতা সংকলনে এসেছে:تَعَمَّدني بِنُصحِكَ في اِنفِرادي *** وَجَنِّبني النَصيحَةَ في الجَماعَه,فَإِنَّ النُصحَ بَينَ الناسِ نَوعٌ *** مِنَ التَوبيخِ لا أَرضى اِستِماعَه,وَإِن خالَفتَني وَعَصِيتَ قَولي *** فَلا تَجزَع إِذا لَم تُعطَ طاعَه”আমাকে একান্ত গোপনে তোমার উপদেশে ধন্য করো এবং জনসমক্ষে উপদেশ দেওয়া থেকে দূরে থেকো। কেননা, মানুষের সামনে উপদেশ দেওয়া হলো এক প্রকার তিরস্কার যা শোনা আমি পছন্দ করি না।আর যদি তুমি আমার মতের বিরোধিতা করো এবং আমার কথা অমান্য করো,তাহলে আমার আনুগত্য না পেলে কোনো হতাশা প্রকাশ কোরো না।”
.
ইবনু রজব আল-হাম্বালী আল-বাগদাদী (রাহিমাহুল্লাহ) [জন্ম: ৭৩৬ হি.মৃত:৭৯৫ হি:] বলেছেন, ” كان السَّلفُ إذا أرادوا نصيحةَ أحدٍ، وعظوه سراً، حتّى قال بعضهم: مَنْ وعظ أخاه فيما بينه وبينَه فهي نصيحة، ومن وعظه على رؤوس الناس فإنَّما وبخه.وقال الفضيل: المؤمن يَسْتُرُ ويَنْصَحُ، والفاجرُ يهتك ويُعيِّرُ”সলফে সালেহীন যখন কাউকে উপদেশ দিতে চাইতেন তখন তারা তাকে গোপনে সদুপদেশ দিতেন। এমনকি তাদের কেউ কেউ বলেছেন: যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইকে একান্তে উপদেশ দিয়েছে সেটাই নসীহা। আর যে ব্যক্তি মানুষের সামনে সদুপদেশ দিয়েছে সে তাকে ভর্ৎসনা করেছে। ফুযাইল (রহঃ) বলেন: ঈমানদার লোক দোষ গোপন রাখে ও উপদেশ দেয়। আর পাপী লোক বেইজ্জত করে ও ভর্ৎসনা করে।[জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ২৩৬ থেকে সমাপ্ত]
.
ইবনু হাযম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:إِذا نصحت فانصح سرا لَا جَهرا، وبتعريض لَا تَصْرِيح، إِلَّا أَن لَا يفهم المنصوح تعريضك، فَلَا بُد من التَّصْرِيح…. فَإِن تعديت هَذِه الْوُجُوه فَأَنت ظَالِم لَا نَاصح”যদি তুমি উপদেশ দিতে চাও তাহলে গোপনে দাও; প্রকাশ্যে নয়। ইঙ্গিতে দাও, সরাসরি নয়। যদি সে তোমার ইঙ্গিত না বুঝে তাহলে সরাসরি উপদেশ দেয়া ছাড়া উপায় নেই…। যদি তুমি এ দিকগুলো এড়িয়ে যাও (অর্থাৎ প্রকাশ্যে অপমান করো বা কঠোরতা অবলম্বন করো) তাহলে তুমি জালিম; তুমি হিতৈষী নও।[আল-আখলাক ওয়াস সিয়ার; পৃষ্ঠা-৪৫) থেকে সমাপ্ত]
.
তবে, প্রকাশ্যে উপদেশ দানের মধ্যে যদি কোন অগ্রগণ্য কল্যাণ থাকে তাহলে প্রকাশ্যে উপদেশ দিতে কোন আপত্তি নেই। উদাহরণত যে ব্যক্তি কোন আকিদার মাসয়ালায় জনসম্মুখে ভুল করেছে; যাতে করে তার কথা দ্বারা মানুষ বিভ্রান্ত না হয় এবং তার ভুলের অনুসরণ না করে। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি সুদকে জায়েয বলে প্রকাশ্যে তার প্রত্যুত্তর দেয়া। কিংবা যে ব্যক্তি মানুষের মাঝে বিদআত ও পাপকর্মের প্রসার ঘটায়। এ ধরণের লোককে প্রকাশ্যে উপদেশ দেয়া শরিয়তসম্মত। বরং কখনও কখনও অগ্রগণ্য কল্যাণ হাছিল ও প্রবল সম্ভাবনাময় ক্ষতি প্রতিরোধার্থে ওয়াজিব।
.
ইমাম ইবনু রজব (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:إن كان مقصوده مجرد تبيين الحق، ولئلا يغتر الناس بمقالات من أخطأ في مقالاته: فلا ريب أنه مثاب على قصده، ودخل بفعله هذا بهذه النية في النصح لله ورسوله وأئمة المسلمين وعامتهم”যদি তার উদ্দেশ্য শুধু সত্যকে স্পষ্ট করা হয় এবং যাতে মানুষ ভুল মত পোষণকারী ব্যক্তির কথার দ্বারা প্রতারিত না হয়, তাহলে এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, সে তার এই সৎ উদ্দেশ্যের কারণে সওয়াবপ্রাপ্ত হবে।আর এই নিয়তের মাধ্যমে তার এই কাজ আল্লাহর জন্য, তাঁর রাসূলের জন্য, মুসলিমদের নেতৃবৃন্দ এবং সাধারণ মুসলিমদের প্রতি কল্যাণকামিতা (নসীহত) করার অন্তর্ভুক্ত হবে।”(আল-ফারকু বাইনান নাসিহা ওয়াত তা’য়ীর’ (উপদেশ ও ভর্ৎসনা এর মধ্যে পার্থক্য; পৃষ্ঠা: ৭)
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:
وإذا كان الإنسان من طبيعته التقصير والنقص والعيب؛ فإن الواجب على المسلم نحو أخيه أن يستر عورته ولا يشيعها إلا من ضرورة. فإذا دعت الضرورة إلى ذلك فلابد منه، لكن بدون ضرورة فالأولى والأفضل أن يستر عورة أخيه؛ لأن الإنسان بشر ربما يخطئ عن شهوة ـ يعني عن إرادة سيئة ـ أو عن شبهة، حيث يشتبه عليه الحق فيقول بالباطل أو يعمل به، والمؤمن مأمور بأن يستر عورة أخيه.هب أنك رأيت رجلاً على كذب وغش في البيع والشراء؛ فلا تفش ذلك بين الناس؛ بل أنصحه واستر عليه، فإن توفق واهتدى وترك ما هو عليه؛ كان ذلك هو المراد، وإلا وجب عليك أن تبين أمره للناس؛ لئلا يغتروا به.وهب أنك وجدت إنساناً مبتلى بالنظر إلى النساء، ولا يغض بصره، فاستر عليه، وانصحه وبين له أن هذا سهم من سهام إبليس؛ لأن النظر – والعياذ بالله – سهم من سهام إبليس يصيب به قلب العبد، فإن كان عنده مناعة، اعتصم بالله من هذا السهم الذي ألقاه الشيطان في قلبه، وإن لم يكن عنده مناعة؛ أصابه السهم، وتدرج به إلى أن يصل إلى الفحشاء والمنكر والعياذ بالله يكون أشد عذاباً.فما دام الستر ممكناً، ولم يكن في الكشف عن عورة أخيك مصلحة راجحة أو ضرورة ملحة، فاستر عليه
ولا تفضحه”
“যেহেতু মানুষের প্রকৃতিগত স্বভাবই হলো ভুল-ত্রুটি, অপূর্ণতা ও দোষে পরিপূর্ণ, তাই একজন মুসলিমের ওপর তার মুসলিম ভাইয়ের ব্যাপারে কর্তব্য হলো তার দোষ-ত্রুটি গোপন রাখা এবং কোনো প্রয়োজন ছাড়া তা মানুষের মধ্যে প্রচার না করা। তবে যদি এমন প্রয়োজন দেখা দেয় যে তা প্রকাশ করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে, তাহলে তা প্রকাশ করতেই হবে। কিন্তু কোনো প্রয়োজন না থাকলে তার দোষ গোপন রাখাই অধিক উত্তম ও শ্রেয়। কারণ মানুষ তো মানুষই; সে কখনো প্রবৃত্তির তাড়নায় (অর্থাৎ খারাপ ইচ্ছার বশবর্তী হয়ে) ভুল করে, আবার কখনো সত্য বিষয়টি তার কাছে অস্পষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে বাতিল কথা বলে বা বাতিল কাজ করে। অথচ একজন মুমিনকে তার মুসলিম ভাইয়ের দোষ-ত্রুটি গোপন রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।ধরা যাক, আপনি একজন লোককে কেনাবেচায় মিথ্যা বলা ও প্রতারণা করতে দেখলেন। তখন তার বিষয়টি মানুষের মধ্যে প্রচার করবেন না; বরং তাকে উপদেশ দিন এবং তার দোষ গোপন রাখুন। অতঃপর যদি আল্লাহ তাকে তাওফীক দেন, সে হিদায়াতপ্রাপ্ত হয় এবং তার সেই কাজ পরিত্যাগ করে, তবে সেটাই তো উদ্দেশ্য। কিন্তু যদি সে তা পরিত্যাগ না করে, তখন মানুষের কাছে তার অবস্থা স্পষ্ট করে দেওয়া আপনার জন্য অপরিহার্য হবে, যাতে মানুষ তার দ্বারা প্রতারিত না হয়।আবার ধরা যাক, আপনি এমন একজন ব্যক্তিকে পেলেন, যে নারীদের দিকে তাকানোর পরীক্ষায় আক্রান্ত এবং সে তার দৃষ্টি অবনত রাখে না। তখনও তার দোষ গোপন রাখুন এবং তাকে উপদেশ দিন। তাকে বুঝিয়ে বলুন, এটি ইবলিসের নিক্ষিপ্ত তীরসমূহের একটি। কেননা (অবৈধ) দৃষ্টি ইবলিসের তীরসমূহের একটি, যার দ্বারা সে বান্দার অন্তরে আঘাত হানে। যদি তার অন্তরে প্রতিরোধশক্তি থাকে, তবে সে আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণের মাধ্যমে শয়তানের নিক্ষিপ্ত এ তীর থেকে আত্মরক্ষা করবে। আর যদি তার সেই প্রতিরোধশক্তি না থাকে, তবে সেই তীর তার অন্তরে বিদ্ধ হবে এবং ধাপে ধাপে তাকে অশ্লীলতা ও মন্দ কাজের দিকে টেনে নিয়ে যাবে। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন। তখন তার শাস্তি আরও কঠিন হবে।সুতরাং যতক্ষণ পর্যন্ত গোপন রাখা সম্ভব এবং তোমার ভাইয়ের দোষ প্রকাশ করার মধ্যে কোনো বড় কল্যাণ বা জরুরি প্রয়োজন না থাকে, ততক্ষণ তার দোষ গোপন রাখো এবং তাকে লাঞ্ছিত করো না।”(ইবনু উসাইমীন; শারহু রিয়াদিস সালিহিন; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৬)
.
মুনকার বা অন্যায় ছড়িয়ে পড়লে তা প্রতিরোধ করা এবং মানুষের সামনে সত্য স্পষ্ট করা অবশ্যই জরুরি। তবে এ উদ্দেশ্যে পাপী ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা আবশ্যক নয়। বরং তার পরিচয় গোপন রেখে বিষয়টি তুলে ধরা অধিকতর হিকমতপূর্ণ হতে পারে। কারণ, এতে একদিকে যেমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সতর্কতা প্রদান করা হয়, অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সংশোধনের সুযোগও অক্ষুণ্ন থাকে। হতে পারে, গোপনে নসিহত ও দোষ গোপন রাখার ফলে আল্লাহ তাকে তাওফীক দান করবেন, সে তাওবা করে নিজের অবস্থার পরিবর্তন করবে এবং তার অনুসারীরাও এ থেকে শিক্ষা ও উপকার লাভ করবে।
.
এ বিষয়ে ইমাম ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) আরও বলেছেন;
“وترك ذكر اسم الشخص فيه فائدتان عظيمتان:الفائدة الأولى: الستر على هذا الشخص.
الفائدة الثانية: أن هذا الشخص ربما تتغير حاله؛ فلا يستحق الحكم الذي يحكم عليه في الوقت الحاضر؛ لأن القلوب بيد الله، فمثلاً: هب أنني رأيت رجلاً على فسق، فإذا ذكرت اسمه، فقلت لشخص: لا تكن مثل فلان؛ يسرق أو يزني أو يشرب الخمر، أو ما أشبه ذلك، فربما تتغير حال هذا الرجل، ويستقيم، ويعبد الله، فلا يستحق الحكم الذي ذكرته من قبل، فهذا كان الإبهام في هذه الأمور أولى وأحسن، لما فيه من ستر، ولما فيه من الاحتياط إذا تغيرت حال الشخص”.
“কোনো ব্যক্তির নাম উল্লেখ না করার মধ্যে দুটি মহৎ উপকার রয়েছে:
প্রথম উপকার: ঐ ব্যক্তির ওপর পর্দা রাখা (তার দোষ গোপন রাখা)।
দ্বিতীয় উপকার: ওই ব্যক্তির অবস্থা পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে। তখন বর্তমান সময়ে তার ব্যাপারে যে বিধান বা মন্তব্য করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে সে তার আর উপযুক্ত নাও থাকতে পারে। কারণ অন্তরসমূহ আল্লাহর হাতেই রয়েছে।উদাহরণস্বরূপ,আমি যদি কোনো ব্যক্তিকে পাপাচারে লিপ্ত দেখি, অতঃপর তার নাম উল্লেখ করে কাউকে বলি তুমি অমুক ব্যক্তির মতো হয়ো না,সে চুরি করে, ব্যভিচার করে, মদ পান করে ইত্যাদি। পরে যদি ঐ ব্যক্তির অবস্থা পরিবর্তন হয়ে যায়, সে সঠিক পথে ফিরে আসে এবং আল্লাহর ইবাদত করতে থাকে, তাহলে আগে যে অপবাদ বা মন্তব্য করা হয়েছিল, তা তার জন্য আর উপযুক্ত থাকবে না। তাই এ ধরনের বিষয়ে ব্যক্তির নাম গোপন রাখা অধিক উত্তম ও ভালো;কারণ এতে একদিকে তার দোষ গোপন থাকে, অন্যদিকে পরবর্তীতে যদি তার অবস্থা পরিবর্তিত হয়ে যায়, তবে তার সম্পর্কে এমন কথা বলার কারণে অন্যায়ে পতিত হওয়ার আশঙ্কা থেকেও নিরাপদ থাকা যায়।”(ইবনু উসাইমীন; শারহু রিয়াদিস সালিহিন; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ২৪৬)
.
পরিশেষে সারকথা হলো: ইসলামের নির্দেশনা অনুযায়ী কোনো মুসলিমের ভুল সংশোধনের মূলনীতি হলো—আন্তরিকতা, প্রজ্ঞা ও কোমলতার সঙ্গে তাকে একান্তে নসিহত করা এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে তার দোষ মানুষের সামনে প্রকাশ না করা। এতে তার সম্মান অক্ষুণ্ন থাকে এবং সংশোধনের সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পায়। তবে যদি কোনো ব্যক্তি প্রকাশ্যে ভ্রান্ত আকীদা, বিদআত, হারাম কাজ বা মানুষের জন্য ক্ষতিকর বিভ্রান্তি প্রচার করে এবং গোপনে নসিহত করার পরও তা থেকে বিরত না হয়, তাহলে তাকে হেয় বা অপমান করার উদ্দেশ্যে নয়; বরং সত্যকে সুস্পষ্ট করা, মানুষকে বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা করা এবং বৃহত্তর অনিষ্ট প্রতিরোধের স্বার্থে তার ভুল প্রকাশ্যে খণ্ডন ও সতর্ক করা শরীয়তসম্মত; বরং কখনো কখনো তা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। আর যেখানে ব্যক্তির নাম উল্লেখ না করেও উদ্দেশ্য অর্জন সম্ভব, সেখানে নাম গোপন রাখাই অধিক হিকমতপূর্ণ ও উত্তম। একই সঙ্গে যে ব্যক্তি মানুষকে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করেন, তার উচিত নিজেও সে আদেশের ওপর আমল করা এবং যে বিষয় থেকে নিষেধ করেন, তা নিজে বর্জন করা। আল্লাহ তাআলা বনী ইসরাঈলকে এ বিষয়ে তিরস্কার করে বলেন, “তোমরা কি মানুষকে সৎকর্মের নির্দেশ দাও এবং নিজেদেরকে ভুলে যাও, অথচ তোমরা কিতাব পাঠ কর? তবুও কি তোমরা বুঝো না?” (সূরা আল-বাকারা: ৪৪)। অনুরূপভাবে, যে ব্যক্তি মানুষকে সৎকাজের নির্দেশ দেয় কিন্তু নিজে তা পালন করে না এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করে অথচ নিজেই তা করে, তার ব্যাপারে হাদীসে কঠিন সতর্কবাণী এসেছে। অতএব, এ বিষয়ে মূল বিবেচ্য বিষয় হলো—কাউকে অপমান বা হেয় করা নয়; বরং একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কল্যাণকামিতা, সত্য প্রতিষ্ঠা এবং ফিতনা ও অনিষ্ট প্রতিরোধ করা। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী।
▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়, ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।

Translate